শুক্রবার

৭ আগস্ট, ২০২৬ ২৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সিলেটে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি পিতা

সিলেট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৭ আগস্ট, ২০২৬ ২২:০৭

শেয়ার

সিলেটে ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি পিতা
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের ৩১ মার্চ, পবিত্র রমজান মাসের বিশতম রোজা। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার হাটখোলা ইউনিয়নের দকড়ি গ্রামের আকাশে যখন সন্ধ্যার আবহ নেমে আসছিল, ঠিক তখনই নেমে আসে এক বিভীষিকা। সেই বিভীষিকার শিকার হন মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আজমান আলীর পরিবারের সদস্য তাজুল ইসলাম। নির্মম হামলার শিকার হয়ে কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি তাঁর বৃদ্ধ পিতা উস্তার আলী।

মুক্তিযুদ্ধে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা শহীদ আজমান আলীর পরিবার স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও যেন শান্তি খুঁজে পেল না। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে বিচারপ্রাপ্তির দীর্ঘ অপেক্ষা-সবকিছু মিলিয়ে পরিবারটি আজও গভীর শোক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনারদিন স্থানীয় বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তাজুল ইসলামের চাচা আজবর আলী। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে ওঁত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। চিৎকার শুনে তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন ভাতিজা তাজুল ইসলাম। স্বজনকে বাঁচাতে গিয়ে তিনিও হামলার শিকার হন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কয়েকদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৪ এপ্রিল রাত তিনটার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

স্বজনদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী, সিলেট সদর উত্তরের চুর সম্রাট সাজিদ বাহিনীর সঙ্গে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই পুর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয় তাজুল ইসলামকে। ঘটনার পর জালালাবাদ থানায় মামলা দায়ের করা হয়, যা পরে আদালতে গড়ায়। আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তাজুল ইসলামের হত্যা মামলাটি বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু প্রায় আড়াই বছর পার হলেও মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। এরই মধ্যে চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তাজুল ইসলামের পিতা উস্তার আলী। ছেলে হত্যার বিচার দেখার আগেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছেলের হত্যার বিচার পাওয়ার আশায় ছিলেন।

স্বজনদের ভাষ্য, প্রতিদিন তিনি মামলার খোঁজখবর নিতেন, আদালতের অগ্রগতি জানতে চাইতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটেনি। তাজুল ইসলামের বৃদ্ধ পিতা উস্তার আলী জীবনের শেষ সময়ে প্রায়ই বলতেন, আমি শুধু আমার ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, সেই বিচার দেখে যাওয়া তাঁর আর হলো না। আজ তাঁর শূন্য ঘর, সন্তানের রক্তাক্ত স্মৃতি আর পরিবারের কান্না যেন নীরবে প্রশ্ন তোলে, একজন শহীদ পরিবারের সন্তানের হত্যার বিচার পেতে আর কত সময় লাগবে? দকড়ি গ্রামের মানুষের চোখে আজও ভেসে ওঠে সেই রমজানের সন্ধ্যা।

গ্রামের প্রবীণরা বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যকে হারানোর বেদনা শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো সমাজের ক্ষতি। বিচারহীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা মানুষের মনে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করে। স্ত্রী, ২ মেয়ে ও ২ ছেলের পরিবারে তাজুল ইসলামের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের একজন উপার্জনক্ষম সদস্যকে কেড়ে নেয়নি। এটি চার সন্তানের মাথা থেকে পিতার ছায়াও সরিয়ে দিয়েছে। যে সংসারটি ছিল হাসি-আনন্দে ভরা, সেখানে আজ নীরবতা আর শোকের ভার। সন্তানরা এখনও অপেক্ষা করছে একদিন হয়তো আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বাবার হত্যাকারীদের বিচার দেখতে পাবে। কিন্তু সেই দৃশ্য দেখার জন্য যিনি সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেছিলেন, সেই পিতা উস্তার আলী আজ আর বেঁচে নেই। তাঁর অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা আর পরিবারের দীর্ঘশ্বাস যেন সময়ের কাছে এক নীরব সাক্ষ্য হয়ে রয়ে গেছে।

তাজুল হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পায়। এরপর মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হলেও নিহতের পরিবার ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় অনড় থাকে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আনাগোনা কমে গেছে।

সম্প্রতি তাজুলের মা জয়তুন নেছা আক্ষেপ করে বলেন, স্বামী মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছেলের হত্যার বিচার দেখে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এখন নানান শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকা এই ষাটোর্ধ্ব নারীও শঙ্কায় আছেন তিনি আদৌ ছেলের হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবেন কি না। তার অভিযোগ, জামিনে মুক্তি পাওয়া আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও বিচার এখনো অধরাই রয়ে গেছে।



আরও পড়ুন:

banner close
banner close