বরের হাতে পাকিস্তানের পতাকা, কনের হাতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ। হাসিমুখের এই দৃশ্য দেখে ক্ষণিকের জন্য যে কেউ আনন্দিত হবেন। মনে হতে পারে এ যেন দুই ভিন্ন রাষ্ট্রের সৌহার্দ্যপূর্ণ কোনো শীর্ষ বৈঠকের আনন্দঘন মুহূর্ত।
শুধু বর-কনের হাতেই নয়, তাদের বিয়ের কার্ডেও ছিল দুই দেশের পতাকার মেলবন্ধন যেখানে লেখা Two hearts, two nations, one beautiful union। কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মেলন নয়, বরং এই দুই পতাকার নিচে স্বাক্ষরিত হয়েছে আজীবনের এক ভালোবাসার চুক্তি। পাকিস্তানের লাহোরের যুবক মুহাম্মাদ তাহির আর বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বাঁশখালীর তরুণী সাদিয়া ইয়াসমিনের বিয়ে যেন হয়ে উঠল দুই ভূখণ্ডের বন্ধুত্ব ও হৃদ্যতার এক প্রতীকী মঞ্চ।
তবে রাজনীতির কোনো টেবিল নয়, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী চকবাজারের এক মিলনায়তনে এভাবেই রচিত হলো এক অন্যরকম ভালোবাসার উপাখ্যান। বর পাকিস্তানের লাহোরের আব্দুল ওয়াহিদের পুত্র মুহাম্মাদ তাহির। ঢাকায় উচ্চশিক্ষার সুবাদে যার বাংলাদেশে বসবাস। অন্যদিকে, কনে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর আব্দুল বাশারের কন্যা সাদিয়া ইয়াসমিন। এক মাস আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হওয়া আলাপন যে এভাবে দুই দেশের পতাকাকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসবে, তা হয়তো ভাবেননি কেউই।
সাধারণত কূটনীতিতে চুক্তি হয় স্বার্থের, আর ভালোবাসায় চুক্তি হয় হৃদয়ের। ফেসবুকের অল্পদিনের পরিচয়ে গড়ে ওঠা ভালোলাগা যখন দুই পরিবারের দরজায় পৌঁছায়, তখন কোনো কাঁটাতার বা ভৌগোলিক দূরত্ব বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
পারিবারিক সম্মতিতে বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট ২০২৬ বিকেল ৪টায় সানাইয়ের সুরে বাঁধা পড়ে দুটি জীবন। শেরওয়ানি আর পাগড়িতে বরের পাকিস্তানি ঐতিহ্য, আর লাল বেনারসিতে কনের চিরায়ত বাঙালি সাজ, সব মিলিয়ে বিয়ের মঞ্চটি যেন পরিণত হয় এক ছোটখাটো দক্ষিণ এশীয় মিলনমেলায়।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের অতীত ভুল বোঝাবুঝি ভুলে, বর মুহাম্মাদ তাহির এই বিয়ের মাধ্যমে, দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সম্প্রীতি ও সম্পর্ক স্থাপনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্যানভাসটি দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক। ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের সংবেদনশীল ও জটিল অধ্যায় পেরিয়ে আজকের বাস্তবতায় দুই দেশের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন বাঁকে।
রাজনীতি, কূটনীতি আর বাইশ গজের ক্রিকেট দ্বৈরথের বাইরেও দুই ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়ে গেছে সংস্কৃতি, বিশ্বাস আর মানবিকতার এক অদৃশ্য যোগাযোগ।
তাহির ও সাদিয়ার বিয়ের কার্ড থেকে শুরু করে বিয়ের মঞ্চে দুই দেশের পতাকার এই সগর্ব উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় সীমানা ও ইতিহাসের পুরনো হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষ আজও বন্ধুত্ব, শান্তি ও ভালোবাসার ভাষায় কথা বলতে চায়। দুই পতাকার নিচের এই ভালোবাসার চুক্তি টিকে থাকুক আজীবন, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
আরও পড়ুন:








