ঢাকার ধামরাই উপজেলার চৌহাট ইউনিয়নে প্রায় চার দশক আগে শুরু হয়েছিল একটি বৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন। দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী পদ্মা-সোনালী গ্রুপের তৎকালীন চেয়ারম্যান, প্রয়াত শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবালের উদ্যোগে ১৯৮০-এর দশকে ১৬ একর জমির ওপর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেয়া হয়। পরে বিভিন্ন পরিকল্পনার পরিবর্তন ঘটতে ঘটতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত,মসজিদ,মাদ্রাসা, শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল তৈরির অবকাঠামো এখন দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে এটি মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। সে সময় সৌদি আরবের এক বিনিয়োগকারী প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এলে পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। দুটি গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করা হয় এবং স্থানীয়দের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হয়।
তবে ১৯৯১ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় প্রকল্পটির পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা হয়। পরে সেখানে একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটিও বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠাতার পিতা ইউনুস খান সেখানে একটি মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসার ব্যয় নির্বাহের জন্য পোশাক কারখানা নির্মাণের পরামর্শ দেন। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন, আর্থিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতায় সেই পরিকল্পনাও থেমে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়,খান মোহাম্মদ ইকবালের পিতা ইউনুস খান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়৷ তারঁ পিতার মৃত্যুর আগে একটি আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ইচ্ছার কথা পরিবারের সদস্যদের জানান। পরে তার সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একই স্থানে ‘ইউনুস খান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় পরিবার৷ নির্মাণকাজও অনেক দূর এগোলেও শেষ পর্যন্ত সেটিও চালু হয়নি।
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় বিশাল ভবনটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা বাসিন্দা পারভেজ৷ তাদের অভিযোগ,ধামরাইয়ের একদম শেষ প্রান্তে হওয়ায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুর ও আশেপাশের এলাকার মাদকসেবীদের সন্ধায় আনাগোনা বেড়ে যায়। তিনি আরও জানান চার বছর পূর্বে মির্জাপুরের এক যুবক ভবনের ছাদে মদ্যপান অবস্থায় মাতলামী করলে ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হয়৷ এর পর থেকে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় যুবক মাহফুজুর রহমান ইমন বলেন, ভবনের ভিতরে ও এর আশেপাশে মাদকসেবীদের হটস্পটে পরিনত হয়েছে৷ এলাকার যুবসমাজ কে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে বাঁচাতে তারা সম্প্রতি মাদকের বিস্তার রোধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এলাকাবাসীর দাবি, বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। সরকার, উদ্যোক্তা পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা হলে বিনিয়োগের অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে রাজধানীর অদূরে একটি আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতাল,নামাজের জন্য মসজিদ ও শিপ্ল প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে লাখো মানুষের চিকিৎসাসেবা ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রতিষ্ঠানটির দেখভালের দায়িত্বে থাকা ইকবাল আহমেদ ফাউন্ডেশনের ম্যানেজার মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, খান মোহাম্মদ ইকবালের পিতা ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাকে উন্নত চিকিৎসা করতে বিভিন্ন দেশে নিতে হয়েছে,যার চিকিংসা ছিল অনেক ব্যায়বুহুল৷ তাই অসুস্থ্য অবস্থায় ছেলেদের স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসার দেয়ার জন্য একটি ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মানের কথা জানান। যাতে বাংলাদেশের মানুষ সহজে এই চিকিৎসা সেবা পায়। প্রয়াত বাবার ইচ্ছা পূরণ করতেই পরবর্তীতে হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেন খান মোহাম্মদ ইকবাল।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠাতার ভাই ও ঢাকা-২০ আসনের সাবেক দুইবারের সংসদ সদস্য খান মোহাম্মদ ইসরাফিল বলেন, সরকার বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান যদি প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়, তাহলে মালিকপক্ষ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
ধামরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আল মামুন বলেন, উপজেলার চৌহাট ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে নির্মানাধীন এই প্রকল্পটি একজন ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে শুরু করেছিলেন। উদ্যোক্তার মৃত্যুর পর থেমে যায় সবকিছু। ইতিমধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে আমরা ডিসি অফিস ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানিয়েছি। উদ্যোক্তা পরিবার সহযোগিতা নিয়ে এই হাসপাতালটি কিভাবে চালু করা যায় সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি।
চার দশক আগে যে স্বপ্ন ধামরাইবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল, তা আজও বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সরকারের সহযোগিতা ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগে একদিন পরিত্যক্ত এই প্রকল্প আবারও মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে।
আরও পড়ুন:








