শুক্রবার

৭ আগস্ট, ২০২৬ ২৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

গ্যাস সংকট নয়, সিদ্ধান্তের কারণে বন্ধ যমুনা সার কারখানা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ আগস্ট, ২০২৬ ১১:১০

শেয়ার

গ্যাস সংকট নয়, সিদ্ধান্তের কারণে বন্ধ যমুনা সার কারখানা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ইউরিয়া উৎপাদনকারী যমুনা সার কারখানা টানা আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ। গ্যাসসংকটকে কারণ হিসেবে দেখানো হলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ নিশ্চিত করা গেলে কারখানাটি সচল রাখা সম্ভব ছিল। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে সার আমদানির ফলে গত আড়াই বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে এবং কৃষিখাত আরও বেশি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি গ্যাসসংকটের কারণ দেখিয়ে যমুনা সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ করা হয়। এরপর ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত কারখানাটি আর চালু হয়নি। অথচ কারখানাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সীমিত গ্যাস সরবরাহেও প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন সম্ভব ছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, কারখানাটি চালু থাকলে প্রতি মাসে প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন করা যেত। কিন্তু উৎপাদন বন্ধ থাকায় সেই পরিমাণ সার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে। বর্তমানে প্রতি টন ইউরিয়া আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮৮ হাজার টাকা। সে হিসাবে মাসে ৩১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার সার আমদানি করতে হয়েছে সরকারকে।

অথচ একই পরিমাণ সার দেশে উৎপাদনে খরচ হতো মাত্র ৭৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৩৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আড়াই বছরেরও বেশি সময়ে সেই অতিরিক্ত ব্যয় গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি ৬০ লাখ টাকায়।

সার কারখানা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যমুনা সার কারখানা সচল রাখতে প্রয়োজন মাত্র ৪২ থেকে ৪৩ পিএসআই গ্যাসচাপ। কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ সামান্য সমন্বয় করলেই এই চাপ নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল।

কিন্তু সে ধরনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে একটি লাভজনক রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হচ্ছে।

কারখানার বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ত্রুটি বাড়ছে এবং পুনরায় চালু করতে অতিরিক্ত ব্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) পরিচালক চান মিয়া চানু বলেন, যমুনা সার কারখানার উৎপাদিত সারের মান ভালো হওয়ায় কৃষকদের কাছে এর চাহিদা বেশি। কারখানাটি বন্ধ থাকলে বাজারে চাপ সৃষ্টি হয় এবং আমদানি-নির্ভরতা বাড়ে।

তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, গ্যাস সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সার সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর সুযোগে অসাধু একটি চক্র কালোবাজারে বেশি দামে সার বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে।

বিএফএর রাজশাহী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সরদার বলেন, যমুনা কারখানার উৎপাদিত সারের মান ভালো হওয়ায় কৃষকদের কাছে এর চাহিদা বেশি। উৎপাদন বন্ধ থাকলে বাজারে চাপ তৈরি হয় এবং আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। অতীতে আমদানি করা সার নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। কৃষকদের স্বার্থে এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমদানি করা সারের মান ও ওজন নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে। অনেকের অভিযোগ, নিম্নমানের সার ব্যবহারের কারণে আগের তুলনায় বেশি সার প্রয়োগ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি কারখানা বন্ধ থাকার ঘটনা নয়; জ্বালানি পরিকল্পনা, শিল্প ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত একটি জাতীয় ইস্যু। দেশীয় উৎপাদন বন্ধ রেখে দীর্ঘদিন আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও কৃষকদেরই বহন করতে হবে।

যমুনা সার কারখানার জিএম (অপারেশন) ফজলুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাটি দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে সারের আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়ার চাহিদা প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা অচল রেখে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো শুধু অর্থনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল নয়, এটি খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রশ্ন উঠেছে, গ্যাস সংকটের অজুহাতে একটি লাভজনক রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বছরের পর বছর বন্ধ রেখে হাজার হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের দায় নেবে কে?



আরও পড়ুন:

banner close
banner close