বৃহস্পতিবার

৬ আগস্ট, ২০২৬ ২২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ডিএনসিতে বদলি বাণিজ্যের নেপথ্যে বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও ডিজি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৬ আগস্ট, ২০২৬ ১১:৩৫

শেয়ার

ডিএনসিতে বদলি বাণিজ্যের নেপথ্যে বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও ডিজি
ছবি সংগৃহীত

দেশের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময়ে যে অধিদপ্তর প্রধান ভূমিকা রাখার কথা, সেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) নিজেই এখন এক প্রভাবশালী দুর্নীতিগ্রস্ত সিন্ডিকেটের কব্জায়। বিগত সরকারের পতনের পর সরকারি সব সংস্থায় সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান চললেও ডিএনসিতে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিযোগ উঠেছে, (২৩ ফেব্রুয়ারি) নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে মো. হাসান মারুফ যোগদানের পর থেকে অধিদপ্তরের চাকা উল্টো ঘুরতে শুরু করেছে। বিগত সরকারের দোসর ও বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’-এর চিহ্নিত নেতারা নতুন ডিজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বনে গিয়ে গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী ‘বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট’। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডিএনসির নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে লোভনীয় অঞ্চলগুলোতে পদায়ন (প্রাইজ পোস্টিং), বদলি এবং মাসোহারা তোলার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এখন এই নিষিদ্ধ সিন্ডিকেটের হাতে।

পুরোনো দাপটে নতুন সিন্ডিকেটের জোট

বিগত দেড় দশকে দলীয় দাপট দেখিয়ে পুরো অধিদপ্তরকে জিম্মি করে রাখা ৩১ ও ৩৫ সদস্যবিশিষ্ট ডিএনসি ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ কমিটির শীর্ষ নেতারা পট পরিবর্তনের পর কিছুদিন চুপ ছিলেন। তবে সম্প্রতি তারা নতুন মহাপরিচালক হাসান মারুফের আস্থাভাজন হিসেবে প্রকাশ্যে এসেছেন। অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছে, ঢাকা মেট্রো, ঢাকা গোয়েন্দা শাখা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেতে কর্মকর্তাদের এখন মোটা অঙ্কের টাকা জমা দিতে হচ্ছে এই সিন্ডিকেটের লবিতে। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন উপ-পরিচালক (ডিডি-প্রশাসন) ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সহ-সভাপতি রাজীব মিনা এবং ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ মেহেদী হাসান। এ ছাড়া পলাতক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক ডিজিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকজন সহকারী পরিচালকও এই চক্রে জড়িত। তারা বর্তমানে ডিজি হাসান মারুফের সাথে গড়ে তুলেছেন নতুন আওয়ামী সিন্ডিকেট।

প্রাইজ পোস্টিংয়ে ১৫ থেকে ২৫ লাখের লেনদেন

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত কয়েক মাসে পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) ও সহকারী পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। ডিএনসির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মতে, প্রতিটি লোভনীয় জোনে বদলির জন্য রেট নির্ধারিত রয়েছে। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ জোনগুলোতে পোস্টিংয়ের জন্য লেনদেন হচ্ছে ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা। গুলশান, বনানী, উত্তরা ও নিকেতন এলাকার বারগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা তোলার জন্য সিন্ডিকেটের নিজস্ব লোক ছাড়া কাউকে পদায়ন করা হচ্ছে না। এ ছাড়া যেসব বিতর্কিত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পূর্বে বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মাদক ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগে বিভাগীয় মামলা হয়েছিল, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তারা আবার রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন।

ডিজির পদত্যাগ দাবি ও দাপ্তরিক অবহেলা

বর্তমান ডিজি হাসান মারুফ এই নিষিদ্ধ চক্রের চক্রব্যূহে জড়িয়ে পড়েছেন এবং তাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ডিজি হাসান মারুফের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে (১০ মে) একটি মানববন্ধনও অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট আমলে ডিজি হাসান মারুফ বিভিন্ন সভা-সেমিনারে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিভিন্ন কটূক্তি ও আপত্তিকর মন্তব্য করতেন। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান ডিজি এখন দাপ্তরিক কাজের চেয়ে নিজের পদোন্নতি নিয়ে বেশি ব্যস্ত। তিনি কার্যালয়ে উপস্থিত না থেকে সারাদিন সচিবালয়ে সচিব পদ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন তদবিরে সময় কাটাচ্ছেন।

সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পথে অন্তরায়

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যেখানে মাদক প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন, সেখানে পতিত সরকারের আমলে কোটি কোটি টাকা কামানো বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতৃবৃন্দ এবং বিতর্কিত ডিজি হাসান মারুফ সরকারকে কতটুকু সহযোগিতা করবেন-তা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফের মুঠোফোনে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা প্রেরণ করা হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।



banner close
banner close