দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জুলাই মাসের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে দ্বিগুণ বা তারও বেশি আসার অভিযোগ করেছেন গ্রাহকরা। তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যেও ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অতিরিক্ত বা ‘ভৌতিক’ বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের দাবি, জুন মাসের মতো একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও জুলাই মাসে অনেকের বিল দ্বিগুণ এসেছে। দিনরাত ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পরও কীভাবে বিল বেড়েছে, তা নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অনেকের অভিযোগ, মিটার রিডাররা সরাসরি বাড়িতে না গিয়ে অনুমানের ভিত্তিতে বিল তৈরি করেছেন।
বরিশালে অতিরিক্ত বিলের অভিযোগ
বরিশাল নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা খান সড়ক এলাকার বাসিন্দা আরিফ আহমেদ বলেন, জুন মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা, আর জুলাই মাসে এসেছে ২ হাজার টাকার বেশি। একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকার পরও মিটার রিডিং অনুযায়ী বিল করা হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরে অভিযোগ জানালে ওজোপাডিকো থেকে পরবর্তী মাসে বিল সমন্বয়ের কথা জানানো হয়।
নগরীর থানা কাউন্সিল এলাকার বাসিন্দা আরিফ এনামুল বলেন, প্রতি মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকার মধ্যে থাকলেও জুলাই মাসে এসেছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। মিটারের রিডিংয়ের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি বিল বেশি হওয়ার বিষয়টি দেখতে পান। অভিযোগ জানানো হলেও এখনও কোনো সমাধান পাননি বলে জানান।
আমানতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আওয়াল জানান, তিনি প্রতি মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতেন। জুলাই মাসে তাকে ৫ হাজার টাকা বিল দিতে হয়েছে। একাধিকবার ওজোপাডিকো-২ কার্যালয়ে গিয়েও তিনি কোনো সমাধান পাননি। তার অভিযোগ, মিটার অনুযায়ী বিল না হওয়ার বিষয়টি কর্মকর্তারা আমলে নিচ্ছেন না।
গত মাসে ওজোপাডিকোর দুটি কার্যালয়ে এ ধরনের অভিযোগ দেওয়া হলেও সাধারণ গ্রাহকেরা কোনো সমাধান পাননি। উপায় না দেখে তারা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হচ্ছেন। একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করেন, প্রতি বছর জুন-জুলাই মাস এলেই তারা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের আশঙ্কায় থাকেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মিটার রিডার এবং বিল প্রিন্ট দেওয়ার দায়িত্বে থাকা এক কম্পিউটার অপারেটর দাবি করেন, ওজোপাডিকোর মাস্টার মিটারে থাকা অতিরিক্ত রিডিং সাধারণ গ্রাহকদের বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি শুধু এ বছর নয়, প্রতি বছর জুন মাসে করা হয়।
তবে ওজোপাডিকো-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার বলেন, সাধারণ গ্রাহকের ওপর কোনো অতিরিক্ত বিল চাপিয়ে দেওয়া হয় না। মিটার অনুযায়ী বিল করা হয়। এরপরও কারও বিল বেশি এলে পরবর্তী মাসে সমন্বয়ের বিধান রয়েছে এবং সেটি করা হচ্ছে।
ময়মনসিংহে দ্বিগুণের কাছাকাছি বিল
ময়মনসিংহ নগরীর কেওয়াটখালী এলাকার জয়নাল আবেদীন জানান, জুন মাসে তিনি ২ হাজার ৫৪২ টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলেও জুলাই মাসে তার বিল এসেছে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
চরপাড়া এলাকার বাসিন্দা শহীদ মিয়া বলেন, প্রতি বছর জুন মাস এলেই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের ফাঁদে পড়তে হয় গ্রাহকদের। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
মাসকান্দা এলাকার লুৎফুল হক বলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের কারণে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। সংসারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেককে ধার করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দক্ষিণের নির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত সাহা বলেন, গত মাসে সরকার নির্ধারিত নতুন রেটে বিদ্যুৎ বিল করা হয়েছে। এছাড়া কোরবানির ঈদের দীর্ঘ ছুটির কারণে বিলিংয়ে কয়েক দিন বেশি সময় লেগেছে। নতুন রেট এবং অতিরিক্ত কয়েক দিনের ব্যবহারের কারণে বিল বেড়েছে। তিনি জানান, কর্মচারীরা মিটার দেখে ছবি তুলেই বিল করেছেন এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি না হয়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহীতেও একই অভিযোগ
রাজশাহী ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, তার বাসার বিদ্যুৎ বিল স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণ এসেছে। তিনি এটিকে অমানবিক ও অনৈতিক উল্লেখ করে উচ্চ পর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
নওহাটা পৌরসভার বীর মুক্তিযোদ্ধা রকিবুল ইসলাম বলেন, হঠাৎ অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল আসায় সাধারণ মানুষ চরম উদ্বেগ ও ভোগান্তিতে পড়েছেন। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এমন অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত বিল নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
নগরীর নওদাপাড়া এলাকার পাভেল ইসলাম বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই গত মাসে তার বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি এসেছে, যা তাকে বিস্মিত করেছে।
একই ধরনের অভিযোগ আরও অনেক গ্রাহক করেছেন। তারা দ্রুত বিল যাচাই করে প্রকৃত হিসাব অনুযায়ী সংশোধনের দাবি জানান।
খুলনায় ২ হাজার ৮০০ টাকার বিল বেড়ে ৬ হাজার ৭৩৬
খুলনা নগরের বাসিন্দা রেজাউর রহমান রনি বলেন, জুন মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৪ হাজার টাকা, যা জুলাই মাসে বেড়ে ৭ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
আইনজীবী মেহেদী হাসান বলেন, আগে প্রতি মাসে তার বাসার বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকার মধ্যে থাকলেও জুলাই মাসে এসেছে ৬ হাজার ৭৩৬ টাকা। তার ভাষ্য, ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পরও দ্বিগুণের বেশি বিল এসেছে।
গৃহবধূ জোবাইয়া নওশিন বলেন, ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পরও কীভাবে বিল এত বেড়েছে, তা নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ।
এ বিষয়ে ওজোপাডিকোর শেখপাড়া তথ্য ও সেবাকেন্দ্রের কমপ্লেন এটেনডেন্ট শেখ আশিকুর রহমান শাওন বলেন, বাড়তি বিল করা হয়নি। নিয়মিত বাড়িতে গিয়ে মিটার রিডিং নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় কিছু মিটারের ব্যবহৃত ইউনিট জমা ছিল। এখন মিটার দেখে সঠিক রিডিং অনুযায়ী বিল করায় প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। তবে কোনো গ্রাহকের মিটার রিডিং থেকে অতিরিক্ত রিডিং লিখে বিল করা হয়ে থাকলে তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে তা সমাধান করা হবে।
আরও পড়ুন:




.jpg)



