চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শীলকূপ ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী জালিয়াখালী বাজার (নতুন বাজার) এখন অস্তিত্ব সংকটে। একসময় উপকূলীয় অঞ্চলের অন্যতম প্রাণবন্ত বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এ বাজারে আজ আর নেই আগের সেই ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। বাজার-সংযুক্ত সড়কগুলোর দীর্ঘদিনের বেহাল অবস্থার কারণে দিন দিন কমছে লোকসমাগম। এতে চরম ব্যবসায়িক মন্দায় পড়েছেন বাজারের তিন শতাধিক ব্যবসায়ী।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনকিচর গ্রাম ও ডাকঘর এলাকার শতবর্ষী এ বাজারটি বাঁশখালীর দারোগা বাজার ও পুরাতন বাজারের সঙ্গে সড়কপথে সংযুক্ত। বাজারের উত্তর-পশ্চিম অংশ দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক ও বিষমুক্ত শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।এখানকার উৎপাদিত শুঁটকি চট্টগ্রামের চাক্তাইসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থার অবনতির কারণে সেই ঐতিহ্যও এখন হুমকির মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মাগরিবের আগমুহূর্তেও বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। স্থানীয়দের মতে, একসময় সন্ধ্যার আগে যেখানে পা ফেলার জায়গা থাকত না, সেখানে এখন হাতে গোনা কয়েকজন ক্রেতা দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজারকে ঘিরে থাকা প্রায় সব সড়কই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বাজারের পশ্চিম পাশে হেডপাড়া হয়ে পশ্চিম মনকিচর নোয়াঘোনা পর্যন্ত সড়কে চলাচল প্রায় বন্ধ। একইভাবে পশ্চিম প্রান্তের স্লুইসগেট থেকে খালাইচ্ছার দোকান ও বড়ুয়ার টেক সড়ক, পূর্ব পাশে ডাকবাংলো সড়ক হয়ে পুরাতন বাজার পর্যন্ত এবং দক্ষিণ পাশে ইউনিয়ন পরিষদ (হাইস্কুল) সড়ক হয়ে টাইমবাজার-গন্ডামারা সড়ক পর্যন্ত–সবগুলো বাজারমুখী সড়কেরই বেহাল অবস্থা। ফলে ভোগান্তির কারণে অনেকেই এ বাজারে আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে।
জালিয়াখালী বাজারের ব্যবসায়ী মো. নাছির হোসাইন বলেন, 'সড়কের দুরবস্থার কারণে আমাদের ব্যবসা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতেই হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারে ৩০০-এর বেশি ব্যবসায়ী রয়েছেন। দ্রুত সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ না নিলে ঐতিহ্যবাহী এ বাজারের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।'
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গত প্রায় ২৫ বছর ধরে বাজার-সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর স্থায়ী সংস্কার হয়নি। বর্ষা মৌসুমে কাদা ও খানাখন্দে চলাচল অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। অনেক যানবাহন বাজারে প্রবেশ করতে চায় না। এতে কৃষিপণ্য, মাছ, শুঁটকি ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়–দুই-ই বেড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থার এই দীর্ঘস্থায়ী দুরবস্থা শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যেই নয়, বাজারকেন্দ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আশপাশের গ্রাম এবং বাজারের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় অনেকেই বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
এ বিষয়ে শীলকূপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাশেদ নুরী বলেন, 'জালিয়াখালী বাজার থেকে গন্ডামারা পুরাতন ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের উন্নয়নকাজের প্রাক্কলন (স্টিমেট) প্রস্তুত হয়েছে। বাজারের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত করে সিসি ঢালাই করা হবে। এছাড়া হাইস্কুল সড়কের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। বর্ষা শেষ হলে কাজ শুরু হবে।'
বাঁশখালী উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহাবুব আলম বলেন, 'জালিয়াখালী নতুন বাজারের পূর্ব পাশ থেকে হেডপাড়া হয়ে গন্ডামারা পুরাতন ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের জন্য প্রায় ছয় কোটি টাকার প্রাক্কলন প্রস্তুত করে টেন্ডারের জন্য পাঠানো হয়েছে। এর আগে গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্রিজ ও স্লুইসগেটের চূড়ান্ত প্রাক্কলনও প্রস্তুত করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলে চলতি বছরের শেষ দিকে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।'
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত বাজার-সংযুক্ত সড়কগুলোর সংস্কার হলে জালিয়াখালী বাজার তার হারানো ঐতিহ্য ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ফিরে পাবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শুঁটকি শিল্পেও নতুন গতি ফিরবে।
আরও পড়ুন:








