রেললাইন নির্মাণ, নিরাপত্তাহীনতা ও অব্যবস্থাপনায় হারাচ্ছে যমুনা ইকো পার্কের বন্যপ্রাণী-সৌন্দর্য
একসময় যমুনা নদীর পশ্চিম তীরে প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বপ্নের ঠিকানা ছিল যমুনা ইকো পার্ক। ঘন সবুজের ছায়া, হরিণের ছুটে চলা, ময়ূরের নৃত্য আর পাখির কোলাহলে মুখর থাকত পুরো এলাকা। পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করত এই পার্কে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই প্রাণবন্ত পার্ক আজ যেন হারিয়ে ফেলেছে তার প্রাণ। রেললাইন নির্মাণ, নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থাপনা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে সবুজ আর বন্যপ্রাণীর আবাস।
বন অধিদপ্তরের আওতায় পাবনা সামাজিক বন বিভাগ ১৯৯৮-৯৯ থেকে ২০০৩-০৪ অর্থবছরের মধ্যে যমুনা সেতুর পশ্চিম গাইড বাঁধ এলাকায় গড়ে তোলে এই বিশাল সামাজিক বনায়ন প্রকল্প। প্রায় ৫৫৫ একর ব্লক বাগান, ১৫ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান, ৫ হাজার ঔষধি গাছ, ৬ হাজার ৪৪০টি শোভাবর্ধনকারী গাছসহ মোট ৫ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে এখানে রয়েছে ৮৭ প্রজাতির বৃক্ষ, যা একসময় এ অঞ্চলকে পরিণত করেছিল এক অনন্য সবুজ বেষ্টনীতে।
দর্শনার্থীরা জানান, যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের পর বন বিভাগ ও সেতু কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে পার্কটির রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হয়। চারদিকে ছিল সুরক্ষিত বেড়া, ছিল কড়া নিরাপত্তাও। ফলে হরিণ, ময়ূর, খরগোশসহ নানা বন্যপ্রাণী নিরাপদ পরিবেশে বিচরণ করত। কিন্তু পরবর্তীতে রেলসেতুর লাইন পার্কের ভেতর দিয়ে নির্মাণ হওয়ায় ভেঙে যায় নিরাপত্তা বেষ্টনী। সৃষ্টি হয় উন্মুক্ত প্রবেশপথ। এতে একে একে হারিয়ে যেতে থাকে বন্যপ্রাণী, আর নষ্ট হতে থাকে প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ।
দর্শনার্থীদের অভিযোগ, যে পার্কে একসময় হরিণ, ময়ূর, খরগোশসহ নানা প্রাণী ছিল, সেখানে এখন দেখা মেলে হাতে গোনা কয়েকটি বানরের। কমে গেছে গাছের ঘনত্বও। আগের মতো আর নেই সেই নির্মল পরিবেশ কিংবা প্রকৃতির আকর্ষণ। ফলে হতাশ হয়েই ফিরতে হচ্ছে অনেক দর্শনার্থীকে।
যমুনা সেতু ইকো পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বাংলা এডিশনকে বলেন, যমুনা রেলসেতু হওয়ার কারণে এখানে মানুষের অবাধ চলাচলের জন্য এখন এই ৬০০ একরের বনাঞ্চলে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির বন্য পশু-পাখি আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় এখানে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল, যা থেকে সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব পেত বলেও জানান তিনি।
শুধু প্রাণী কমে যাওয়াই নয়, পার্কের সব খাঁচার অবকাঠামোও এখন জরাজীর্ণ। খাঁচা ছেড়ে বানরগুলো অবাধে ঘোরাফেরা করছে পার্কজুড়ে, যা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও তৈরি করেছে উদ্বেগ।
পার্ক কর্তৃপক্ষের দাবি, দ্রুত নিরাপত্তা গেট নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত বেড়া সংস্কার, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং সমন্বিত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলে যমুনা ইকো পার্ক আবারও ফিরে পেতে পারে তার হারানো সৌন্দর্য। পাশাপাশি সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ বনভূমি হিসেবে একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এই বনভূমি। সরকারের রাজস্ব আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও যোগান দিতে পারে অর্থের।
আরও পড়ুন:
.jpg)







