বৃহস্পতিবার

৩০ জুলাই, ২০২৬ ১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩

দুমকি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন পিআইওর বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

মোঃ ইমরান হোসেন, পটুয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৬ ২২:৩০

শেয়ার

দুমকি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন পিআইওর  বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
ছবি: সংগৃহীত

পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচার, কাজ না করেই অর্থ উত্তোলন এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে একাধিক প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন হলেও বাস্তবে কাজ না হওয়া, কোথাও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে পুরো বিল তুলে নেয়া এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তা প্রতিটি ইউনিয়নে নিজের নিয়ন্ত্রণে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তুলেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বরাদ্দের অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয় এবং প্রকল্প সভাপতিদের কাছ থেকে কমিশন আদায় করা হয়।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো, এক ইউপি সদস্যের স্বামীর কাছে দুটি প্রকল্পের কমিশন বাবদ ৪৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন পিআইও মোহাম্মদ আলী। এ-সংক্রান্ত একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।অনুসন্ধানে কথা হয় একাধিক প্রকল্প সভাপতি ও ইউপি সদস্যের সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, প্রতিটি প্রকল্প থেকে প্রতি লাখে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়। কেউ কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার বিল আটকে রাখা হয়। তাদের দাবি, যেসব প্রকল্পের কাজ ভালো হয়েছে সেখান থেকে ২০ শতাংশ এবং যেসব প্রকল্পের কাজ নিম্নমানের হয়েছে, সেগুলো থেকেও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পিআইও নিজেই নিজের পছন্দের লোকজন দিয়ে প্রকল্পের কাজ করান। কোথাও নামমাত্র কাজ দেখিয়ে, আবার কোথাও কোনো কাজই না করেই বরাদ্দের পুরো অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ প্রকল্প তিনি নিজে পরিদর্শন করেন না; অফিস সহায়ককে দিয়ে আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন দেখিয়ে বিল অনুমোদন করা হয়।

দুমকি উপজেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় টিআর, কাবিখা, কাবিটা, খাদ্য সহায়তা ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সরকারি বরাদ্দ আসে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাধারণ মানুষ এসব বরাদ্দ সম্পর্কে অবগত না থাকায় সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে যেসব প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে সেগুলো হলো, লেবুখালী ইউনিয়নের প্রকল্প নং-৭: মকবুল শরীফ বাড়ি থেকে সিদ্দিক শরীফের দোকান পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সরেজমিনে কোনো কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মোসা. জেসমিন বেগম বলেন, তিনি বরাদ্দ ও কাজ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। উপজেলা পরিষদ চত্বরের প্রকল্প নং-২২: গাড়ি ধৌত করার র‍্যাম্প সংলগ্ন স্থানে মাটি ভরাট ও ইট সলিংয়ের জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও বাস্তবে কোনো কাজের প্রমাণ মেলেনি। প্রকল্প সভাপতি চেয়ারম্যান মো. আজহার আলী মৃধার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকল্প নং-৯: উপজেলা পরিষদের মাঠ ও ইউএনওর বাসভবনের ফুল বাগানে মাটি ভরাটের জন্য ২ লাখ ১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও সরেজমিনে কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রকল্প সভাপতি আব্দুল জলিল বলেন, বিষয়টি পিআইও জানেন।

প্রকল্প নং-৬: পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনী কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কোনো কেন্দ্রে ক্যামেরা স্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কার্তিকপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ ভরাট প্রকল্প: ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের এই প্রকল্পে সরেজমিনে গিয়ে ওই নামে কোনো বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অথচ বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

এছাড়া শ্রীরামপুর, পাংগাশিয়া ও লেবুখালী ইউনিয়নের একাধিক রাস্তা সংস্কার প্রকল্পে বরাদ্দের তুলনায় অতি সামান্য কাজ করে পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, অনেক প্রকল্পে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার কাজ দেখিয়ে ২ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করা হয়েছে।

অনিয়ম, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, কাজ না করেই বিল উত্তোলন এবং স্বপরিবারে বিদেশ গমনের জন্য অনাপত্তিপত্র নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মোহাম্মদ আলীকে তার মুঠোফোন কল দিলে তিনি প্রতিবেদককে সরাসরি দেখা করতে বলেন বলে ফোন কেটে দেন।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোঃ দেলোয়ার হোসেনকে তার মুঠোফোনে ও হট্সআপে একাধিক বার কল দেয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেনি।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পটুয়াখালীর সহকারী কমিশনার তাপস বিশ্বাস জানান, মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ ছিলো তারপর সেখানে আমরা অভিযানে যাই। সেই অভিযানের রিপোর্ট হেড অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি কিন্তু বেশ কিছুদিন যাবত আমাদের কমিশন নাই যার কারনে সেই রিপোর্ট পাস হয়ে আসেনি। তবে পাশ হয়ে আসলে কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নিবো।

জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী জানান, পিআইও বিরুদ্ধে দূর্নীতির চিঠি এসেছে এবিষয়ে কাজ চলছে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কাজী মোঃ বদরুউজ্জামান জানান, অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হয়েছে এবং সেই রিপোর্ট কতৃপক্ষের কাছে জমা দেয়া হয়েছে।

এদিকে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পিআইও মোহাম্মদ আলীর বিরুদ্ধে অতীতে বিভাগীয় তদন্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধান হলেও তিনি এখনও একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রচ্ছায়ায় তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন।



banner close
banner close