সোমবার

২৭ জুলাই, ২০২৬ ১২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

প্রযুক্তিনির্ভর চাঁদাবাজির নতুন মুখ ডেভিড ইমন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬ ১১:২০

শেয়ার

প্রযুক্তিনির্ভর চাঁদাবাজির নতুন মুখ ডেভিড ইমন
ছবি সংগৃহীত

চট্টগ্রামে প্রযুক্তিনির্ভর চাঁদাবাজির নতুন কৌশল হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তিনি পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী এবং বর্তমানে তার হয়ে নগরীতে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী তৎপরতা ও বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

চাঁদা না দেওয়ায় হামলার অভিযোগ

সপ্তাহখানেক আগে চট্টগ্রাম নগরের চন্দনপুরায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুই দিনের আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পরও টাকা না পেয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী ৩০ থেকে ৩৫ জন যুবক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অফিসে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়, কর্মীদের মারধর করে এবং নগদ অর্থ ও মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, হামলাটি ডেভিড ইমনের সরাসরি নির্দেশে পরিচালিত হয়েছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর নগরের জিইসি মোড়ের আরেকটি আইএসপি প্রতিষ্ঠানের মালিকের মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ কলে জানানো হয়, ডিডিএনের অবস্থা তো দেখেছেন। টাকা না দিলে আপনারও একই পরিণতি হবে।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসে অন্তত তিনটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ডেভিড ইমন বাহিনীর বিরুদ্ধে। অক্সিজেন, মুরাদপুর, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ ও জিইসি এলাকার একাধিক ব্যবসায়ীও একই ধরনের হুমকির শিকার হয়েছেন। নিরাপত্তার শঙ্কায় অনেকেই থানায় অভিযোগ করেননি।

একজন ভুক্তভোগী আইএসপি মালিক জানান, ফোন ধরলেই বোঝা যায় কেন কল এসেছে। টাকা না দিলে হামলা হবে, অফিস টিকবে না, পরিবার নিয়েও ভয় থাকে। এ কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে দেন।

অপরাধ জগতে দ্রুত উত্থান

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের বাসিন্দা ডেভিড ইমনের বাবা মো. মুসা পেশায় কৃষক। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা ইমনের পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। কৈশোরে তিনি কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়েন। পরে স্থানীয় অপরাধচক্রের মাধ্যমে বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্কে যুক্ত হন।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একের পর এক সহিংস ঘটনায় সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি দ্রুত বড় সাজ্জাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তাকে নগরীর আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্যতম সক্রিয় অপারেশন পরিচালনাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

একাধিক হত্যা মামলায় অভিযোগ

পুলিশের নথি অনুযায়ী, গত দুই বছরে অন্তত সাতটি হত্যা মামলায় ডেভিড ইমনের নাম এসেছে। এর মধ্যে রবিবার (৩০ মার্চ) ২০২৫ বাকলিয়ার আলোচিত জোড়া হত্যা, শুক্রবার (২৩ মে) ২০২৫ পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা এবং বুধবার (২৮ আগস্ট) ২০২৪ আনিস ও মোহাম্মদ হাসানকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত এখনো চলমান।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, এসব হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার পাশাপাশি অপরাধ জগতে নিজের প্রভাবও বাড়িয়েছেন তিনি। একসময় সাজ্জাদ গ্রুপের মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে ছিলেন ছোট সাজ্জাদ নামে পরিচিত সাজ্জাদ হোসেন। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর নগরী অংশের নেতৃত্বে আসেন ডেভিড ইমন এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় হন মোহাম্মদ রায়হান আলম।

বড় সাজ্জাদ বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বড় সাজ্জাদের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন ডেভিড ইমন। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বড় সাজ্জাদ দেশের বাইরে অবস্থান করলেও চট্টগ্রামে তার নেটওয়ার্ক সচল রেখেছেন ইমন। তার নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক তরুণের একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী সক্রিয় রয়েছে।

পুলিশের দাবি, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী এলাকায় গ্রুপটির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। চাঁদাবাজি, জমি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, হামলা ও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

আইএসপিএবির উদ্বেগ ও পুলিশের অভিযান

চন্দনপুরার হামলার পর ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) চট্টগ্রাম বিভাগ জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংগঠনের আহ্বায়ক রাজিব শাহরিয়ার বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানে হামলার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে আইএসপি ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি, টেলিফোনে হুমকি ও হামলার ঘটনা বেড়েছে, যা পুরো শিল্পের জন্য গভীর নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করেছে। তিনি ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী জানান, বাকলিয়ায় ইন্টারনেট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় ডেভিড ইমনসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। র‍্যাব-৭ ও পুলিশের পৃথক অভিযানে মূল সংগঠক মাইকেলসহ মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদ বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান তার হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছেও তিনি একাধিকবার ফোনে চাঁদা দাবি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।



banner close
banner close