সোমবার

২৭ জুলাই, ২০২৬ ১১ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৭ শহীদের স্বজনদের আহাজারি: দ্রুত বিচারের দাবি পরিবারের

মোছাব্বির হাসান সজীব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬ ২৩:১০

শেয়ার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৭ শহীদের স্বজনদের আহাজারি: দ্রুত বিচারের দাবি পরিবারের
ছবি বাংলা এডিশন

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সারাদেশের মতো উত্তাল ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ওই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে জেলার ১৭ জন জীবন দিয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা দিয়েছে। তবে এখনো অনেক আহত ব্যক্তি মানবেতর জীবনযাপন করছেন এবং নিহতদের পরিবার দোষীদের বিচারের দাবিতে কাঁদছেন।

গেজেটে শহীদদের তালিকা প্রকাশ

গত (১৫ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রকাশিত গেজেটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৭ জন শহীদকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়। এর মধ্যে বাঞ্ছারামপুর, নবীনগর ও সরাইলের ৪ জন করে এবং সদর, আখাউড়া, কসবা, বিজয়নগর ও নাসিরনগরের একজন করে রয়েছেন। তারা হলেন শহীদ তুহিন আহমেদ, শহীদ ইমরান, শহীদ ইসমাইল সরকার, শহীদ আশিকুর রহমান, শহীদ জাহিদুজ্জামান তানভীন, শহীদ তানজিল মাহমুদ সুজয়, শহীদ রফিকুল ইসলাম, শহীদ জাহিদ হোসেন, শহীদ মোবারক হোসাইন, শহীদ মাহমুদুল হাসান, শহীদ রায়হান উদ্দিন, জসিম, শহীদ হোসাইন, শহীদ জাবির ইব্রাহীম, শহীদ জোবায়ের ওমর খাঁন, শহীদ মোহাম্মদ সাজিদুর রহমান ওমর এবং শহীদ ইমরান।

আন্দোলনের বিস্তৃতি

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছিল সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহর থেকে শুরু করে নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর, সরাইল, আখাউড়া, কসবা, বিজয়নগর, নাসিরনগর ও আশুগঞ্জে প্রতিদিন চলেছে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ। শুধু নিজ জেলাতেই নয়, ঢাকার উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অসংখ্য শিক্ষার্থী ও শ্রমজীবী মানুষ।

আশুলিয়ায় পুড়িয়ে মারা সুজয়ের পরিবারের আর্তনাদ

স্বজন হারানোর বেদনা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে তাদের পরিবার। সোমবার (৫ আগস্ট) আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে নিহত হন নবীনগরের কলেজছাত্র তানজিল মাহমুদ সুজয়। প্রমাণ লুকাতে তার মরদেহ পুলিশ ভ্যানে পুড়িয়ে বিকৃত করার অভিযোগ করেন স্বজনরা। এ বিষয়ে শহীদ তানজিল মাহমুদের বোন ইশরাত জাহান অ্যানি, বাবা সফিকুল ইসলাম ও মা তাহমিনা আক্তারের বক্তব্য রয়েছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তার মা এখন শুধু ছেলে হত্যার বিচার চাইছেন। সুজয়ের মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে একমাত্র ছেলে হত্যার দায়ে, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিচার দাবি করেছেন। স্বৈরাচার হাসিনার পতনে, সুজয়ের ভূমিকা অপরিসীম উল্লেখ করে, দায়ীদের দ্রুত বিচার দাবি করেছেন এলাকাবাসী।

অন্য শহীদ পরিবারের অবস্থা

অন্যদিকে, কাঁচপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান বাঞ্ছারামপুরের আশিকুর রহমান। ছোটবেলায় পিতৃহীন ছেলেকে হারিয়ে তার মা আজ নিঃস্ব। এ বিষয়ে শহীদ আশিকুরের মা কুলসুম বেগমের বক্তব্য রয়েছে। সরাইলের ঝালমুড়ি বিক্রেতা জসিম নিহত হওয়ায়, প্রতিবন্ধী সন্তানসহ ৫ শিশু নিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন তার স্ত্রী শাহানা বেগম। এ বিষয়ে শহীদ জসিমের স্ত্রী শাহানা বেগমের বক্তব্য রয়েছে।

আহত যোদ্ধাদের মানবেতর জীবন

কেবল নিহতরাই নন, গণঅভ্যুত্থানে গুরুতর আহত হয়েছেন জেলার শত শত মানুষ। সোমবার (৫ আগস্ট) শহরের টিএ রোডে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে দুই চোখ হারান সিরাজুল ইসলাম, তার শরীরে বিদ্ধ হয় ১৮টি বুলেট আর এই যন্ত্রণা নিয়েই বেঁচে আছেন তিনি। এ বিষয়ে আহত জুলাই যোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য রয়েছে। বিরাসার এলাকায় গুলিবিদ্ধ কলেজছাত্র দ্বীন ইসলাম এখনো পুরোপুরি সুস্থ নন। একই ঘটনায় পিঠে গুলি ও অস্ত্রের কোপে আহত হন রাসেদ মিয়া। এছাড়া বিজয়নগরের শাহ আলম মাথায় ইটের আঘাতে এবং কসবার আল-আমিন ঢাকার রায়েরবাগে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন নিদারুণ কষ্টে। এ বিষয়ে জুলাই আহত শাহ আলম ও মো. আল-আমিনের বক্তব্য রয়েছে।

সহায়তা ও বিচারের দাবি

জুলাই অভ্যুত্থানে যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের পরিবার যেন ভালোভাবে চলতে পারে সেজন্য অনুদান বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় আলেম সমাজ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার তৎকালীন সংসদ সদস্য রবিউল মুক্তাদির চৌধুরীর নির্দেশে জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রুবেল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন শোভন ও লিমন আল স্বাধীনের নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর একাধিকবার নারকীয় হামলা চালানো হয়।

এ বিষয়ে সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী আব্দুর রাজ্জাক, জাসাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদস্য সচিব বায়েজিদ আহমেদ হেলাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, জেলা জজ আদালতের আইনজীবী জাহিদ-বিন-আল-আমিনের বক্তব্য রয়েছে। বর্তমান সরকার শহীদ পরিবার ও আহতদের সহায়তা এবং হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলে জানান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব সিরাজুল ইসলাম সিরাজ। তবে, জেলা জজ আদালতের আইনজীবী জাহিদ-বিন-আল-আমিনের অভিযোগ, অনেক আহত ব্যক্তি এখনো মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বিচার শুরু না হওয়ায় অনেকেই এখনো হুমকি-ধমকির শিকার হচ্ছেন।

মামলা ও পুলিশের বক্তব্য

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ইতোমধ্যে অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। এ বিষয়ে এএসপি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রকীব উর রাজা বাংলা এডিশনকে বলেন, এসব মামলায় ইতোমধ্যে অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে নানা আয়োজনে শহীদদের স্মরণ করছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী। শহীদদের রক্তে লেখা এই ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে। তবে, স্থানীয়দের দাবি, এই আত্মত্যাগ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন প্রতিটি হত্যার বিচার ও আহতদের পুনর্বাসন নিশ্চিত হবে।



banner close
banner close