উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে নদীটি। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলের নিশ্চিন্তপুর ও চরগিরিশ ইউনিয়নের অন্তত ১০-১৫টি গ্রামের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক।
শুক্রবার সকালে কাজিপুরের মেঘাই পয়েন্টে যমুনার পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৮৫ মিটার, যা ২৪ ঘণ্টায় ৪ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
গত জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে প্রায় দেড় মাস ধরে চলমান নদীভাঙনে প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনা।
স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে দুই শতাধিক বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত শত বিঘা ফসলি জমি, গাছপালা ও যোগাযোগ সড়কও ভাঙনের শিকার হয়েছে। বর্তমানে ভাঙনের মুখে রয়েছে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কয়েকটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা এবং কয়েকশ বসতবাড়ি।
এলাকাবাসী জানায়, গত এক মাসে চরগিরিশ ফ্লাড সেন্টার বাজার থেকে ভেটুয়া এলাকা পর্যন্ত দুই শতাধিক বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না হলে পশ্চিম চরগিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয়দের শঙ্কা, এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে চরগিরিশ ইউনিয়নের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে।
চরগিরিশ ইউনিয়নের ছালাল গ্রামের কৃষক রইচ উদ্দিন বলেন, ‘প্রায় দেড় মাস ধরে ভাঙন চলছে। কিন্তু ভাঙন রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। কখন যে বসতবাড়ি নদীতে চলে যায়, সেই আতঙ্কে রাত কাটছে।’
চরগিরিশ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আল আমিন সরকার বলেন, ‘দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পশ্চিম চরগিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি খুব শিগগিরই বিলীন হয়ে যাবে।’
চরদোরতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুহুল আমিন জানান, বিদ্যালয় ভবনটি ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে পশ্চিম চরগিরিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত তিনতলা ভবনটি বর্তমানে নদী থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে অবস্থান করছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘যমুনা নদী বিদ্যালয়ের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর পাঠদান নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’
কাজিপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল হুদা বলেন, ‘ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা বিদ্যালয় ভবনটি নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যমুনার পানি বৃদ্ধি পেলেও গত ২৪ ঘণ্টায় সামান্য কমেছে। শুক্রবার সকালে কাজিপুরের মেঘাই পয়েন্টে যমুনার পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৮৫ মিটার, যা ২৪ ঘণ্টায় ৪ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৯৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ হার্ডপয়েন্টে পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৩২ মিটার। সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ সেন্টিমিটার পানি কমে বিপৎসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কাজিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, উপজেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে ভাঙনকবলিতদের জন্য ৮৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়নের জন্য আরও বরাদ্দ দেয়া হবে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘নিশ্চিন্তপুর এলাকায় জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলমান রয়েছে। তবে চরাঞ্চলের স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে বড় ধরনের প্রকল্প প্রয়োজন। এ বিষয়ে সমীক্ষা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।’
আরও পড়ুন:








