বৃহস্পতিবার

২৩ জুলাই, ২০২৬ ৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

অনলাইন জুয়ার নেশায় নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো মানুষ

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ১৪:১৮

শেয়ার

অনলাইন জুয়ার নেশায় নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো মানুষ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

হাতে একটি স্মার্টফোন, আর মাত্র একটি ক্লিক। অল্প লাভের আশায় শুরু হলেও সেই এক ক্লিকই অনেকের জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে সর্বনাশের দিকে। অনলাইন জুয়ার নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে সঞ্চয়, ভেঙে পড়ছে পরিবার, আর অর্থ চলে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ জুয়া চক্রের হাতে। প্রযুক্তির অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে এটি এখন দেশের অন্যতম উদ্বেগজনক সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

সহজে লাভের প্রলোভন ও বিস্তার

মোবাইল অ্যাপ ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। বিকাশ, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে সহজেই অর্থ লেনদেনের সুযোগ থাকায়, খুব অল্প সময়েই জড়িয়ে পড়ছে অনেকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তরুণ ও কিশোররা। বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে লাখ লাখ মানুষ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অল্প টাকায় বড় লাভের প্রলোভন দেখিয়ে শুরু হলেও, পরে অনেকেই হারিয়ে ফেলছে জীবনের সব সঞ্চয়। শুধু শিক্ষার্থী বা তরুণ নয়, বিভিন্ন পেশার মানুষও এই আসক্তির শিকার হচ্ছে।

সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব শাহেদ

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন শাহেদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অনলাইন ক্যাসিনোর বিজ্ঞাপন দেখে কৌতূহলবশত খেলায় যুক্ত হন। প্রথম দিনেই মাত্র ২০০ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকা লাভ হওয়ায় তার মধ্যে তৈরি হয় জেতার নেশা। সেই সাময়িক লাভই হয়ে ওঠে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ। অল্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জুয়া তার নেশায় পরিণত হয়। কখনও জিতেছেন, তবে শেষ পর্যন্ত হারিয়েছেন ভিটেমাটি বন্ধক রেখে প্রায় ২০ লাখ টাকা। পরে ধার-দেনা করে আরও অর্থ হারিয়ে এখন আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছেন তিনি। আরেক ভুক্তভোগী জানান, অনলাইন জুয়া তার জীবনের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। তার ভাষায়, এটি কোনো খেলা নয়, বরং ধ্বংসের একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ।

পারিবারিক অশান্তি ও অপরাধের ঝুঁকি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগীর স্ত্রী জানান, জুয়ায় আসক্ত হওয়ার পর তার স্বামীর আচরণ পুরোপুরি বদলে গেছে। জিতলে স্বাভাবিক থাকেন, হারলেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। একসময়ের সুখী সংসার আজ অশান্তিতে ভরে গেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী নারী। রহিম জাবেদ, বাংলা এডিশন কে।

স্থানীয়দের দাবি, অনলাইন জুয়ার নেশা অনেক তরুণকে অপরাধের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। অর্থের সংকটে কেউ জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, প্রতারণাসহ নানা অপরাধে। ফলে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত আসক্তি নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠছে।

আইনি দণ্ড ও প্রশাসনিক তৎপরতা

বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। সংশ্লিষ্ট আইনে অনলাইন জুয়ায় অংশগ্রহণ, পরিচালনা বা এ ধরনের প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া অর্থপাচার বা সংঘবদ্ধভাবে জুয়া পরিচালনার মতো অপরাধে আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযানও অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন মো. সাইফুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ফেনী।

প্রতিরোধের কার্যকর উপায়

একটি ক্লিকে শুরু হওয়া অনলাইন জুয়ার নেশা শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিতে পারে অর্থ, পরিবার, এমনকি ভবিষ্যৎও। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবারের সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং তরুণদের প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহারে উৎসাহিত করাই হতে পারে এই নীরব মহামারি ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



banner close
banner close