মঙ্গলবার

২১ জুলাই, ২০২৬ ৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩

স্বজন হারানোর বেদনা থেকে নিওসেভারের যাত্রা

সাগর মন্ডল, বাগেরহাট প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬ ১৫:১১

শেয়ার

স্বজন হারানোর বেদনা থেকে নিওসেভারের যাত্রা
ছবি বাংলা এডিশন

জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে স্বজন হারানোর বেদনাই বাগেরহাটের এক তরুণকে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে অনুপ্রাণিত করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার চরবানিয়ারী দক্ষিণপাড়া গ্রামের ধিলন রায় তৈরি করেছেন প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিওসেভার’, যার মাধ্যমে মাত্র তিন ক্লিকেই জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতায় সেরা তিনটি স্টার্টআপের একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে উদ্যোগটি।

স্বজন হারানোর বেদনা থেকে উদ্যোগ

খুলনা নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী ধিলন রায় ব্যক্তিগত শোককে শক্তিতে পরিণত করে এই উদ্যোগের সূচনা করেন। জরুরি মুহূর্তে অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে প্রিয়জনকে হারানোর বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাকে নতুন কিছু ভাবতে বাধ্য করে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি তৈরি করেন ‘নিওসেভার’, একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে খুব অল্প সময়েই অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়া সম্ভব।

ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণ, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রযুক্তিপ্রেমীদের যুক্ত করে তিনি একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে আইসিটি বিভাগের আয়োজিত তারুণ্য স্টার্টআপ: সম্ভাবনার বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ডিইআইইডি প্রকল্পের ইউইএইচপি প্রতিযোগিতায় ৩০০টিরও বেশি উদ্ভাবনের মধ্যে নিওসেভার সেরা তিনটি স্টার্টআপের একটি হিসেবে নির্বাচিত হয়।

এই স্বীকৃতির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে অবদানের জন্য প্রকল্পটি এক লাখ টাকার সিড ফান্ডও পেয়েছে। গ্রামের সাধারণ একটি পরিবার থেকে উঠে আসা ধিলনের এই অর্জন প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলে মেধা শুধু শহরে নয়, দেশের প্রত্যন্ত জনপদেও বিশ্বমানের উদ্ভাবনের জন্ম দিতে পারে।

শিক্ষকদের গর্ব

ধিলনের এই অর্জনে গর্বিত তার শিক্ষকরাও। চরবানিয়ারী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অঞ্জন কুমার বাড়ৈ বলেন, মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো একটি উদ্যোগ নিয়ে ধিলন কাজ করছে, যা শুধু তাদের বিদ্যালয়ের নয়, পুরো এলাকার জন্যই গর্বের বিষয়।

উদ্ভাবকের লক্ষ্য

উদ্যোক্তা ধিলন রায় বলেন, জরুরি সময়ে অ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাকে এই প্ল্যাটফর্ম তৈরির অনুপ্রেরণা দিয়েছে। পরবর্তীতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ইনোভেশন হাবের সহযোগিতায় প্রকল্পটি আরও সমৃদ্ধ হয়। এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তরুণ, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রযুক্তিবিদরা এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে সহজে এই সেবা পৌঁছে দেওয়াই তার লক্ষ্য।

প্রত্যাশা স্থানীয়দের

স্থানীয়দের বিশ্বাস, ডিজিটাল বাংলাদেশে এমন একটি উদ্যোগ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত হলে অনেক মূল্যবান প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে বলেও মনে করছেন তারা।

ছেলের এমন মানবিক উদ্যোগে আবেগাপ্লুত ধনঞ্জয় রায়। তিনি চান, নিওসেভার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ুক, যাতে জরুরি মুহূর্তে কোনো মানুষ শুধু অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে জীবন না হারায়।

পৃষ্ঠপোষকতার প্রত্যাশা

প্রযুক্তি তখনই সবচেয়ে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে আসে। বাগেরহাটের এক তরুণের স্বপ্ন থেকে জন্ম নেওয়া ‘নিওসেভার’ এখন সেই আশার নাম। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই উদ্যোগ একদিন দেশের প্রতিটি প্রান্তে জরুরি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ, দ্রুত এবং মানুষের নাগালের মধ্যে পৌঁছে দেবে।



banner close
banner close