পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার বসতবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। তবে অভিযুক্তরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রশাসন জানিয়েছে, ঘটনাটি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবার (১৮ জুলাই) সকাল পর্যন্ত উপজেলার কাঠালতলী বাজারসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (১৭ জুলাই) রাত ১২টার পর থেকে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা চলে। ঘটনার সময় বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল এবং সেখানে কোনো মানুষ ছিলেন না।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘরের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল পুড়ে গেছে। কিছু মালামাল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে।
পরিবারের অভিযোগ
বাড়িটির মালিক কাজী মিজানুর রহমান লাভলু মাধবখালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং মাধবখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর লাভলু কাজী সপরিবারে এলাকা ছেড়ে চলে যান। তার মা বাড়িতে একা বসবাস করতেন। শুক্রবার বিকেলে অসুস্থ হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হলে বাড়িটি ফাঁকা হয়ে যায়। এরপর রাতে এক্সকাভেটর দিয়ে একতলা ভবনটি গুঁড়িয়ে দিয়ে ভেতরে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।
লাভলু কাজীর স্ত্রী মেহেরুন্নেছা শিল্পী অভিযোগ করেন, তার শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সুযোগে মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান ওরফে পলাশ হাওলাদার এবং সাবেক সভাপতি মনির খন্দকারের নেতৃত্বে প্রায় আড়াইশ মানুষ বুলডোজার দিয়ে তাদের ছয় কক্ষের পাকা বসতঘরটি গুঁড়িয়ে দেন।
তার দাবি, ভবন ভাঙার আগে ঘরে থাকা চারটি রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ওভেন, এসি, স্বর্ণালংকারসহ পরিবারের ব্যবহার্য প্রায় সব মালামাল লুট করা হয়। লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা। এরপর প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, খবর পেয়ে ঢাকা থেকে বাড়িতে এসে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন, হামলার আগে কাঠালতলী বাজার ও আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়। কেউ ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলে তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
তার ভাষ্য, বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ ফুট দূরে কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। গভীর রাতে বুলডোজারের শব্দ শুনে পুলিশ ঘটনাস্থলে এলেও হামলাকারীরা ধাওয়া দিলে পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার কারণে সরে যান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কাঁঠালতলী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়।
লাভলু কাজীর ফুফাতো বোন মুকুল বেগম বলেন, একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
ঘটনার সময় লাভলু কাজীর ভাই মশিউর রহমান বাবলু কাজী ফেসবুকে বাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের কয়েকটি ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি প্রশাসনের কাছে সহায়তা চেয়েও তা পাননি বলে দাবি করেন।
লাভলু কাজী বলেন, জমি কিনে তিনি বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কী কারণে তার বাড়ি ভাঙা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের সঙ্গে তার কোনো বিরোধও ছিল না। তিনি দাবি করেন, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর অনুসারী এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা তার বাড়িতে হামলা চালিয়েছেন। প্রথমে এক্সকাভেটর দিয়ে ভবনের সামনের অংশ ভেঙে আলমারিতে থাকা স্বর্ণালংকার, মূল্যবান কাগজপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করা হয়। পরে পুরো ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে আগুন লাগানো হয়।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
দেশের বাইরে থাকায় অভিযোগের বিষয়ে পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি ফেসবুকে লিখেছেন, এ ঘটনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তাকে জড়িয়ে মিথ্যা বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। তিনি এ ধরনের অপপ্রচারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহীন চৌধুরী অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, শুক্রবার তিনি ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরেছেন। তাই ঘটনার বিষয়ে তিনি অবগত নন। তিনি দাবি করেন, ২০০৩ সালে পাবলিক লাইব্রেরির জন্য রেজিস্ট্রি করা জমি দখল করে চেয়ারম্যান বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। জমি বা বাড়ি ভাঙচুরের বিষয়ে তার বা তাদের কোনো আগ্রহ নেই।
অভিযুক্ত মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মাধবখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মনির খন্দকার বলেন, পাবলিক লাইব্রেরির জমি দখল করে মিজানুর রহমান বাড়ি নির্মাণ করেছেন, যা ভূমি অফিসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। সেখানে তার কোনো জমি নেই বলে তিনি দাবি করেন।
মির্জাগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহাবুদ্দিন নান্নু মুন্সী বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা নেই। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধ করে থাকলে তার দায় দল নেবে না।
প্রশাসনের বক্তব্য
মির্জাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত স্টেশন কর্মকর্তা ইব্রাহীম জানান, শনিবার সকাল ৬টার পর খবর পেয়ে একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, কাজী মিজানুর রহমানের বসতঘরে আগুন জ্বলছে এবং বাড়ির সামনের অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে চারটি কক্ষের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল বলেন, অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। সেখানে বাড়িটিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত অবস্থায় পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললেও কেউ ঘটনার বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি। কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে থানা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত একটি আবেদন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রয়েছে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি তদন্ত করছেন।
মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তৌহিদুজ্জামান বলেন, বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর পেয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:








