শনিবার

১৮ জুলাই, ২০২৬ ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

বাঁশখালীতে স্মরণকালের বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ক্ষতি ১১৬ কোটি টাকার বেশি

শিব্বির আহমদ,বাঁশখালী প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ১৭:২১

শেয়ার

বাঁশখালীতে স্মরণকালের বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ক্ষতি ১১৬ কোটি টাকার বেশি
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ১১৬ কোটি ১৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ছয়দিনের টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়ে ফসলি জমি, পুকুর-ঘের, গবাদিপশুর খামার, সড়ক, সেতু-কালভার্ট এবং হাজারো বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলেও সর্বত্র রয়ে গেছে ধ্বংসের চিহ্ন।

উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তুত করা একীভূত ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ–এই তিন খাতেই সবচেয়ে বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার পরিবার এখনও পুনর্বাসনের অপেক্ষায় রয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, শুক্রবার বিকেলে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শনের সময় সরকারের উচ্চপর্যায়ে এই ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়েছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যায় উপজেলার ২৬ হাজার ৮০০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মোট ৩ হাজার ৪৪৬ দশমিক ৫ হেক্টর কৃষিজমির বিভিন্ন ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে গ্রীষ্মকালীন সবজি ১ হাজার ১০০ হেক্টর, আউশ ধান ২ হাজার ২৩৫ হেক্টর, আমন বীজতলা ৫৫ হেক্টর, পেঁপে ২০ হেক্টর, পান ১০ হেক্টর, আদা ২০ হেক্টর এবং হলুদ ৬ দশমিক ৫ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক মূল্যায়নে কৃষিখাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, 'বন্যার কারণে মাঠপর্যায়ে ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। দ্রুত বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সহায়তা দেয়া গেলে তারা আবার উৎপাদনে ফিরতে পারবেন।'

উপজেলা মৎস্য বিভাগের একীভূত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় ৪ হাজার ২০০টি পুকুর ও দিঘি এবং ৩১০টি চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ হাজার ৮৮০ দশমিক ৫৭ হেক্টর পুকুর-দিঘি এবং ১ হাজার ২৮৫ দশমিক ৭৩ হেক্টর ঘের ক্ষতির মুখে পড়ে। বন্যায় প্রায় ৯৮৩ দশমিক ৩৩ মেট্রিক টন মাছ, ১ হাজার ২৮৫ দশমিক ৭০ লাখ মাছের পোনা এবং ২০০ লাখ চিংড়ি পিএল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ১০ জন জেলে, ১৫০টি নৌকা-ট্রলার এবং ২ হাজার ৫০টি মাছ ধরার জাল ক্ষতির শিকার হয়েছেন। মৎস্য বিভাগের হিসাবে মাছ, পোনা, চিংড়ি পোনা ও অবকাঠামো মিলিয়ে ৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. তৌসিব উদ্দিন বলেন, 'বন্যার পানিতে বিপুল পরিমাণ মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি সহায়তা অত্যন্ত প্রয়োজন।'

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ১ হাজার ২৭০টি গবাদিপশুর খামার এবং ৭৪০টি পোল্ট্রি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুয়েল মজুমদার বলেন, 'অনেক খামারে খাদ্যসংকট ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের পুনর্বাসন এবং প্রাণিসম্পদের চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।'

সৃষ্ট বন্যায় উপজেলা প্রশাসনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৫৮টি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৬০টি ব্রিজ ও কালভার্ট ভেঙে গেছে। সারফেসসহ মোট ১০৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এছাড়া ৫ হাজার ১১০টি বসতঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং ৬ হাজারটি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খানখানাবাদ ও কাথরিয়া ইউনিয়ন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১৭৫ মেট্রিক টন চাল, ১০ হাজার ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, ৭ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার, ১ লাখ ৩০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি হাইজিন বক্স, ১৫৬টি জেরিকেন এবং পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে প্রায় ৮০ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ৩৫ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সমন্বয়হীনতার কারণে ত্রাণের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়নি। তাদের মতে, এখন শুকনো খাবারের চেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘর পুনর্নির্মাণ, কৃষি উপকরণ, মাছের পোনা, গবাদিপশুর খাদ্য ও পুনর্বাসন সহায়তার প্রয়োজন বেশি।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, 'প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে। যেখানে পানি আটকে থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রয়েছে। এখনও মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। গৃহহারা অধিকাংশই আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছেন। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়নে আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি। সরকারিভাবে কিছু টিন এসেছে তা যথাযথভাবে বন্টন করা হবে।'



আরও পড়ুন:

banner close
banner close