শনিবার

১৮ জুলাই, ২০২৬ ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সরাইলে হাদিমের মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা: পাল্টাপাল্টি মামলায় পুরুষশূন্য দুই গ্রাম

মোছাব্বির হাসান সজীব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৫৯

শেয়ার

সরাইলে হাদিমের মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা: পাল্টাপাল্টি মামলায় পুরুষশূন্য দুই গ্রাম
ছবি: সংগৃহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কালিকচ্ছ বাজারে পাওনা টাকার বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘটিত তিন দিনব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরও কাটেনি উত্তেজনা। সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু এবং অন্তত ৫০ জন আহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের হওয়া পাল্টাপাল্টি মামলার জেরে গ্রেপ্তার আতঙ্কে ধর্মতীর্থ ও সূর্যকান্দি গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ সদস্য বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। ফলে দুই গ্রামেই বিরাজ করছে থমথমে পরিস্থিতি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সংঘর্ষের কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এলাকায় স্বাভাবিক পরিবেশ পুরোপুরি ফিরে আসেনি। অনেক দোকানপাট সীমিত পরিসরে খুললেও সন্ধ্যা নামলেই দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দেয়। অধিকাংশ বাড়িতে এখন নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরাই অবস্থান করছেন।

এদিকে নিহত হাদিম মিয়ার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের আলোচনা ও ধোঁয়াশা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, তিনি হামলার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। আবার অন্য একটি পক্ষের দাবি, এটি হৃদরোগজনিত স্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি বিরাজ করছে।

ঘটনার সময় উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা শফিক জানান, তিনি হাদিম মিয়াকে কালিকচ্ছ বাজারের প্রধান সড়ক থেকে পশ্চিম দিকে বাজারের ভেতরে দৌড়ে যেতে দেখেন। কিছুক্ষণ পর বাজারের একটি হোটেলে গিয়ে দেখতে পান, হাদিম মিয়াকে মাথায় পানি ঢেলে প্রাথমিকভাবে সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তার মুখ দিয়ে রক্তবমি হচ্ছিল। পরে বাজারের ব্যবসায়ী আশরাফুল ও ফারুকের সহযোগিতায় তাকে সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। শফিকের ভাষ্য, হাসপাতালে নেওয়ার সময় হাদিম মিয়ার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন বা রক্ত তিনি দেখেননি।

তবে হাদিম মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভাঙচুর ও মারামারির অভিযোগে অপর পক্ষও পৃথক মামলা দায়ের করেছে। এসব মামলায় কয়েক ডজন ব্যক্তিকে আসামি করায় গ্রেপ্তার এড়াতে অনেকেই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।

এ ঘটনায় নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাখাওয়াত হোসেন ঘটনার দিন সিলেটে একটি বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া আসমাউল ইসলাম ওরফে সাগর মৃধা ঘটনার সময় হবিগঞ্জ বিআরটিএ কার্যালয়ে ব্যবসায়িক কাজে অবস্থান করছিলেন। তাদের স্বজনদের দাবি, ঘটনার স্থলে উপস্থিত না থাকলেও তাদের মামলার আসামি করা হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার দিন হাসপাতাল থেকে আশরাফুল, জুনায়েদ ও ফারুককে আটক করা হয়েছিল। পরে বাজারের নাইটগার্ড হিসেবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ায় ফারুককে ছেড়ে দেয়া হয়। অন্যদিকে আশরাফুল ১১ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

সরাইল থানা পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় নিয়মিত টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি মামলার তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিরোধ ও অবিশ্বাসের জেরেই পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়েছে। তারা উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শন, গুজবে কান না দেয়া এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও তদন্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

উল্লেখ্য, হাদিম মিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ হত্যা নাকি অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা তা তদন্ত ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণের ভিত্তিতেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। বিষয়টি বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তাধীন।



banner close
banner close