অতীতের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য প্রাচীনকালে ব্যবহৃত বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র। কালের বিবর্তনে যা প্রায় বিলুপ্তির পথে বসেছিল, আজ সেই বাঁশই যেন ফিরে পেয়েছে নতুন জীবন। একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে শোভা পেত বাঁশের তৈরি ঝুড়ি, কুলা, চাটাই, ডালা কিংবা আসবাবপত্র, যা ছিল আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সময়ের স্রোতে প্লাস্টিক আর আধুনিক উপকরণের দাপটে সেই ঐতিহ্য যখন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই নীলফামারীর সৈয়দপুরে সেই পুরনো কারুকার্যকে নতুন রূপে বাঁচিয়ে তুলেছেন কিছু সংগ্রামী মানুষ। পরিবেশবান্ধব এই পণ্য আজ শুধু দেশের বাজারেই নয়, পাড়ি দিচ্ছে সুদূর বিশ্ববাজারেও।
নীলফামারীর সৈয়দপুরে গ্রামীণ জনপদে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে এক নতুন সম্ভাবনার গল্প। পরিবেশবান্ধব বাঁশজাত পণ্য এখন শুধু ঘর সাজানোর উপকরণ নয়, বরং তা পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে। কুটির শিল্পের এই নীরব বিপ্লব বদলে দিচ্ছে এলাকার বহু মানুষের জীবনযাত্রা।
উপজেলার উত্তর সোনখুলি ডাঙ্গাপাড়া এলাকার উদ্যোক্তা হাজীমুল ইসলাম এই পরিবর্তনের একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। এক সময় সাধারণ সেলাই মিস্ত্রি হিসেবে সীমিত আয়ে সংসার চালাতেন তিনি। তবে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন তাকে থেমে থাকতে দেয়নি। বাঁশের কাঁচামালের মধ্যে সম্ভাবনা খুঁজে পেয়ে তিনি গড়ে তোলেন একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ, যা বর্তমানে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে রূপ নিচ্ছে।
তার কারখানায় তৈরি হচ্ছে বাঁশের ঝুড়ি, গৃহসজ্জার উপকরণ, ফার্নিচার সামগ্রী ও বিভিন্ন হস্তশিল্প পণ্য। স্থানীয় প্রায় ২০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিক এসব পণ্য তৈরিতে যুক্ত রয়েছেন, যাদের শ্রম ও দক্ষতায় প্রতিটি পণ্য হয়ে উঠছে মানসম্মত শিল্পকর্ম।
উদ্যোক্তা হাজীমুল ইসলাম জানান, শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। বাজারের অনিশ্চয়তা, কাঁচামাল সংকট আর সীমিত সুযোগের মধ্য দিয়েই পথচলা শুরু হয়েছিল তার। তবে অনলাইন মাধ্যমের ব্যবহার, স্থানীয় ক্রেতাদের আস্থা এবং মানসম্মত উৎপাদনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি পৌঁছে যান রপ্তানি সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে।
হাজীমুলের এখন লক্ষ্য আরও বড়। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেলে তিনি এই ক্ষুদ্র উদ্যোগকে আধুনিক উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করতে চান। আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, নতুন নকশার পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরিই তার প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি এলাকার তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলারও পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ায় বাঁশজাত সামগ্রীর জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে। স্বল্প উৎপাদন খরচ, প্রাকৃতিক উপকরণ এবং নান্দনিক নকশার কারণে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে এসব পণ্যের আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে।
সৈয়দপুরের এই কুটির শিল্প এখন শুধু একটি উৎপাদন কেন্দ্র নয়, বরং হয়ে উঠেছে আত্মনির্ভরশীলতার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
এ বিষয়ে সৈয়দপুর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মশিউর রহমান জানান, এ ধরনের ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে এসব প্রতিষ্ঠান আরও এগিয়ে যেতে পারে। আমরাও তাদের জন্য সুপারিশ করবো।
আরও পড়ুন:








