টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলার বন্যা পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। লাখো মানুষ বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও আশ্রয়ের সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। পানি কমতে শুরু করলেও দেখা দিচ্ছে ডায়রিয়া, জ্বর ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ। একই সঙ্গে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে না পারায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১২ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন। দেশের ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ।
গত ৪ জুলাই থেকে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের অন্তত ৫৮টি উপজেলা প্লাবিত হয়। একই সময়ে রাজধানী ঢাকাতেও ভারী বর্ষণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
বন্যাদুর্গত এলাকায় সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্দারা কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি সংগ্রহ করছেন। অনেক এলাকায় কয়েক দিন ধরে রান্না বন্ধ রয়েছে এবং শুকনো খাবারেই দিন কাটছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা। মৌলভীবাজারে ডায়রিয়া, জ্বর ও অ্যালার্জির রোগী বাড়ছে। চট্টগ্রামে ৭৫ জন সাপে কাটা এবং ২৫ জন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সিভিল সার্জনের কার্যালয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিকিৎসক ও নার্সদের ছুটি বাতিল করে জরুরি চিকিৎসাসেবা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে।
ত্রাণ বিতরণ নিয়ে প্রশাসনের দাবি ও স্থানীয়দের অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান দেখা গেছে। সরকার সাত জেলার জন্য ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ২ হাজার ৬৫০ টন চাল বরাদ্দ দিলেও অনেক দুর্গত এলাকা এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার পানিবন্দী মানুষের কাছে নদীর প্রবল স্রোত ও সড়ক ধসের কারণে নিয়মিত ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
অন্যদিকে হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে পানি কিছুটা কমলেও নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৭০ হাজার মানুষ এখনো পানিবন্দী রয়েছেন। পানি কমার পরও বিশুদ্ধ পানির সংকট ও কাদাজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু অতিবৃষ্টি নয়, অবৈধ বাঁধ, মাছ ও লবণের ঘের রক্ষায় স্লুইসগেট বন্ধ রাখা এবং জলপ্রবাহে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি হওয়াও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ। প্রশাসন এসব বাধা অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তিস্তা অববাহিকা, ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ দ্রুত কাটার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
আরও পড়ুন:








