রবিবার

১২ জুলাই, ২০২৬ ২৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

মাধবপুরে চুরি আতঙ্ক: ১৫ দিনে গরু-ট্রান্সফরমার-ক্যাবলসহ একাধিক চুরি

শেখ বেলাল, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬ ১৫:৩৬

শেয়ার

মাধবপুরে চুরি আতঙ্ক: ১৫ দিনে গরু-ট্রান্সফরমার-ক্যাবলসহ একাধিক চুরি
ছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় গত ১৫ দিনে গরু, হাঁস-মুরগি, সেচ পাম্পের বৈদ্যুতিক ক্যাবল, ট্রান্সফরমার, মোবাইল ফোন এবং বসতঘরে সিঁদ কেটে একের পর এক চুরির ঘটনায় জনমনে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটায় সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্কে থাকছেন উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের ঘনশ্যামপুর গ্রামের কৃষক সোহরাব উদ্দিনের গোয়ালঘরের তালা কেটে চারটি গরু চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। তিনি জানান, প্রতিদিনের মতো রাতে গরুগুলো গোয়ালঘরে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে উঠে দেখেন তালা ভাঙা এবং গোয়ালঘর খালি। বহু কষ্টে লালন-পালন করা চারটি গরুই ছিল তার পরিবারের প্রধান সম্বল।

এর পরদিন শুক্রবার দিবাগত রাতে একই ইউনিয়নের মঙ্গলপুর গ্রামের আকবর আলীর গোয়ালঘরের তালা ভাঙার চেষ্টা করে চোরেরা। তবে পরিবারের সদস্যরা টের পেয়ে গেলে তারা পালিয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা সামছুল আলম জানান, ১০ থেকে ১২ দিন আগে দেবপুর গ্রামের রহমান সর্দারের চারটি, নুরুল্লাপুর গ্রামের দুটি এবং রসুপুর গ্রামের ইয়ামিন মিয়ার দুটি গরু চুরি হয়েছে।

এর আগে গত ৪ জুলাই দিবাগত রাতে ছাতিয়াইন ইউনিয়নের শ্রীমতপুর গ্রামের সাবেক সেনাসদস্য রুবেল মিয়ার গোয়ালঘরের চারটি তালা কেটে একটি উন্নত জাতের গাভি চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অন্য গরুগুলো নিতে পারেনি।

ছাতিয়াইন ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা আলাই মিয়া জানান, গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে শাহপুর-এক্তিয়ারপুর সড়কে বাড়ি ফেরার পথে দুই শ্রমিকের কাছ থেকে নগদ ২২ হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়।

এ ছাড়া একই ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামে বশির মিয়ার ঘরের সিঁদ কেটে একটি গরু এবং জালাল মিয়ার ঘরের জানালার গ্রিল কেটে দুটি গরু চুরি হয়েছে।

একই সময়ে সাকুচাইল গ্রামের চার কৃষকের জমিতে সেচকাজে ব্যবহৃত সাবমারসিবল পাম্পের বিদ্যুতের ক্যাবল চুরি হয়েছে বলে জানান ইউপি সদস্য আবুল খায়ের। এতে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

চোরের হাত থেকে রক্ষা পায়নি হাঁস-মুরগিও। দাসপাড়া গ্রামের আব্দুর রহমান জানান, গভীর রাতে তার হাঁস-মুরগির ঘরের তালা কেটে কয়েকটি হাঁস-মুরগি জবাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। একই রাতে একই গ্রামের সায়েদুল ইসলামের বাড়িতেও একই ঘটনা ঘটে।

নোয়াপাড়া ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামে গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যায় চোরেরা। এছাড়া কয়েক দিন আগে নোয়াপাড়া গ্রামের সামছুল ইসলামের ঘর থেকে একটি মোবাইল ফোন চুরি হয়েছে।

জগদীশপুর ইউনিয়নের খরকি গ্রামের ইউপি সদস্য আজমল মিয়া জানান, গত এক সপ্তাহে তার এলাকায় একাধিক বাড়িতে সিঁদ কেটে চুরি হয়েছে। চুরক মিয়া, মাসুক মিয়া ও এনায়েত উল্লাহর বাড়ি থেকে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা।

বাঘাসুরা ইউনিয়নের বাসাসুরা উচ্চ বিদ্যালয়েও গত ৭ জুলাই চুরির ঘটনা ঘটে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক জানান, চোর শনাক্ত হওয়ার পর চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

একই ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মাধবপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের বাড়িতেও জানালার গ্লাস খুলে দুটি মোবাইল ফোন চুরি করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, গত ১৫ দিনের ধারাবাহিক চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কৃষকদের অভিযোগ, একটি গরু, একটি ট্রান্সফরমার বা সেচ পাম্পের ক্যাবল শুধু সম্পদ নয়—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ। রাতের অন্ধকারে সেই সম্বল হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।

চৌমুহনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সোহাগ বলেন, সর্বশেষ গরু চুরির ঘটনাটি তার জানা নেই। তবে গত ১০ থেকে ১২ দিনের কয়েকটি চুরির ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবগত। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ হয়েছে এবং পুলিশ ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছে।

কাশিমনগর পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান জানান, ঘনশ্যামপুর গ্রামের গরু চুরির শিকার ব্যক্তিকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আগে এলাকায় প্রায়ই চুরি হতো। কয়েকজন চিহ্নিত চোর গ্রেপ্তার হওয়ার পর কিছুটা কমেছিল।

তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, ধারাবাহিক চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, রাতের পুলিশ টহল জোরদার এবং গ্রামাঞ্চলে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে সাধারণ মানুষের জানমাল ও কষ্টার্জিত সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।



banner close
banner close