ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অধীনে 'অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির' আওতায় দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণে ব্যপক অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগির অভিযোগ উঠেছে। নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন বাস্তবমুখী ট্রেডে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের কথা থাকলেও, রহস্যজনক কারণে মাত্র ১৫ দিনের একটি ‘কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন’ কোর্সে নামমাত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতি প্রশিক্ষণার্থীকে দেয়া হচ্ছে ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা। আর এই বিপুল অংকের সরকারি ভাতার লোভেই দলিত ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর একাংশকে জিম্মি করে একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভোলা জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তর গত ১১ ই জুন আবেদন কারীদের মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে ১৬ই জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত অনগ্রসর জনগোষ্ঠিসমূহে ১৫ দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করেন । এতে জেলার ৭ উপজেলা থেকে ১১৩ জন আগ্রহী ১৪ টি বিষয়ের উপর বেসিক প্রশিক্ষণের আবেদন করেন। পরে বেসিক কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন এর উপর ২৫ জন প্রার্থীকে নির্বাচিত করেন জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর।
১১৩ জন প্রার্থীর মেধ্য ৭ জন ইসলাম ধর্মের প্রার্থী ছিলো আর বাকী প্রার্থীরা সবাই সনাতন ধর্মের প্রার্থী।
প্রশিক্ষণে শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫ জনকে টিকানোর বিষয়টি বাংলা এডিশনের নজরে আসলে ২রা জুলাই ভোলা সমাজ সেবার উপ পরিচালক রজত সুভ্রূ সরকার এর নিকট ২৫ জন প্রশিক্ষণার্থীর তথ্য চাইলে তিনি বলেন তথ্যে প্রশিক্ষণার্থীদের ঠিকানা যুক্ত মোবাইল নং রয়েছে তাই তাদের এই তথ্য দেয়া যাবে না।
পরে তিনি প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া প্রার্থীদের মোবাইল নং বাদ দিয়ে ২৫ জনের একটি ফর্দ দেন।
এ বিষয়ে বাংলা এডিশন তথ্য সংগ্রহ শুরু করলে জানাজানি হলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেলাজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
তবে বাংলা এডিশন এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রশিক্ষনার্থীরা সবাই ভোলা সদর উপজেলার জুতা সেলাই কারক ও রবিদাস সংগঠনের কথিত সভাপতি
নিতাই চন্দ্র দাস, ও দক্ষিণ আইচা উপজেলার তফন কুমার ( লালমোহন উপজেলার মুচি) এবং লালমোহন উপজেলা রবিদাস সংগঠনের সভাপতি ধিরন বাবুর নিকট আত্মীয়। ধিরন, নিতাই দুজন শালা ও ভগ্নিপতি এবং তপন ধিরনের ভাগ্নে ও নিতাইর বায়রা ছেলে।
এদের মধ্যে আপন ভাই-বোন, আপন ২ বোন সহ একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তিও রয়েছে। অনুসন্ধানে জানাযায় ২৫ জন প্রশিক্ষণার্থীর ১১ জনই পরস্পর নিকট আত্মীয়।
নিতাই ও তপনের আত্মীয় বলে বরিশালের বোখাইনগর ইউনিয়নের জুতা ব্যাবসায়ী স্বজন দাসের শ্ত্রী রত্না দাস সুযোগ পায় এই প্রশিক্ষণ।
তপন ও ধিরন বরিশাল থেকে আনিত
প্রশিক্ষণার্থী রত্না দাসের প্রণোদনার ৫০ হাজার টাকার চেক রেখে দেন।
এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত আজ ১১ জুলাই ও রত্নাকে কোন টাকাই দেন নি এই দালাল চক্র।
সাধারণ অনগ্রসর জনগোষ্ঠী যাতে এই লোভনীয় ভাতার খোঁজ না পায়, সেজন্য বিজ্ঞপ্তিটি ব্যাপকভাবে প্রচার না করে গোপন রাখার চেষ্টা করেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক ।
ভোলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রজত শুভ্র সরকার যেন অতি গোপনে প্রশিক্ষার্থীদের থেকে অবৈধ সুবিধা নিতে পারে সেজন্য বিশ্বস্ত নিতাই,তপন ও ধিরন দালাল কে নিয়োগ করেন।
আর এই সুযোগে দালাল চাক্রটি শুধু তাদের নিকট আত্মীয়দের সুযোগ করে দেন প্রশিক্ষণের।
প্রশিক্ষণ শেষে পরিকল্পনা মোতাবেক প্রশিক্ষার্থীদের কাছে থেকে সর্বনিন্ম ১০ হাজার টাকা আদায় করে দালাল চক্রের প্রধান নিতাই চন্দ্র দাস ও তার সহযোগী তপন চন্দ্র ও ধীরেন চন্দ্র।
মূলত সমাজ সেবা অধিদপ্তরের উপ পরিচালক রজত সুভ্রূ সরকার এই ১৫ লাখ টাকা ভাগাভাগি করার মত জঘণ্য অপরাধ ঢাকতে প্রশিক্ষণে সুযোগ পাওয়া ব্যাক্তিদের তথ্য দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
এদিকে মোবাইল নং না থাকায় প্রশিক্ষণে সুযোগ পাওয়া ব্যাক্তিদের সনাক্ত করা ও মোবাইল নং সংগ্রহে এই প্রতিেবেদক বেগপেতে হয়েছে।
কথা হয় বরিশালের বাসীন্দা প্রশিক্ষণার্থী রত্না দাশের সাথে তিনি বলেন প্রশিক্ষণ শেষ হওয়া মাত্রই তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা কমিশনের জন্য তার চেক রেখে দেন দালাল চক্র।
প্রশিক্ষণে সুযোগ দেয়া হয়েছে তার আপন ভাই তপন দাস কে ও।
ঘুষের টাকার বিষয়ে রত্নার স্বামী সজল বলেন, "১০ হাজার টাকার জন্য ওরা আমার শ্ত্রীর চেক রেখে দিয়েছে, এ বিষয়টি আমি সমাজ সেবা অফিসের ০১৩২৪ ২৩৫৩৫৭ স্যার এর নং একাধিক বার কল করি সে কল রিসিভ করে না । পরে ঐ অফিসের ০১৭১৬ ৩০৭৭৯৮ নং এ কল দিলে তিনি আমাদের কে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে বলেন।
দালাল চক্রের মুল হোতা নিতাই বাবু বলেন রত্নার টাকা তার ভাই তপন দাসের নিকট ফেরৎ দেয়া হয়েছে। তপন ও রত্না আপন ভাই বোন বলে জানান নিতাই। তবে নিতাই তার মেয়ে তার ভাগ্নে,ভাগ্নি ও তার ভাই দুলালের কণ্যা রুপা দাস ও পিপা দাস সহ ৬ জন কে এ প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিয়েছেন বলে স্বীকার করেন। তিনি আরো বলেন দাদু আমাকে স্যার একটু ভালো জানে বলে আমার একটা অনুরোধ রাখে, এই যে কদিন আগে মুসলিম সম্প্রদায়ের কালামের ক্যান্সারের রোগীর জন্য ৫০ হাজার টাকা পাস করাইয়া দিছি স্যার দিছে, স্যার আমারে একটু ভালো জানে বলেই তো দিছে।
তপন বলেন আমি ও আমার বোন ররিশালের বাসীন্দা রত্না আমার মেশ নিতাই দাসের মাধ্যমে ঢুকেছি,কাকে কি দেয়া হবে তা বিস্তারিত মেশ জানে।
নিতাই বাবুর হাত ধরে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন ভোলা সদর উপজেলার বেলুমিয়া ইউনিয়নের উৎপল চন্দ্র, উৎপল একটি বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
তার সাথে কথা বলতে বাংলা এডিশন তার স্কুলে গেলে পালিয়ে যায় উৎপল। পরে ফোন করে উৎপল জানান আমি কিছুই জানিনা সব জানে নিতাই বাবু।
লালমোহনে সীমা রানী জানান, তার কাছ থেকে তপন চন্দ্র সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে দিতে হবে বলে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে। তার জানা মতে আরো কয়েকজনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছে তপন। তবে সীমার কাছ থেকে নেয়া ১০ হাজার টাকা তিনি তপন চন্দ্রকে প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে উদ্ধার করেছেন।
অন্যদিকে দালাদ চক্রের আরেক সদস্য লালমোহনের ধীরেন চন্দ্র দাস বলেন নির্বাচিতরা আমার আত্মীয় স্বজন কিন্তু তারা যোগ্য বলে ডিসি স্যার ইন্টারভিউর মাধ্যমে তাদের নিছে। আমি মাত্র ফরম পুরন করে দিছি, সিমু ও রত্নার থেকে টাকা নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন রত্নার টাকা এসে নিয়ে যেতে বলছি আর সিমুর টাকা দিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আপনার সামনে রত্নার টাকা ফেরৎ দেয়া হবে ।
এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বলেন
স্বচ্ছতার সাথে নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছে, জেলা প্রশাসক মহদয় মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে তাদের নির্বাচিত করেছের।
২৫ জন সবাই একই ধর্মের কেন? এমন বিষয়ে তিনি বলেন আমি ধর্ম দেখিনি দেখেছি সম্প্রদায় এখানে সকল সম্প্রদায়ের লোক ছিলো।
ভোলা জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান জানান, ওই প্রশিক্ষণ কমিটির সভাপতি ছিলেন জেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা । স্বচ্ছতার বিষয়ে আমি সমাজ সেবা কর্মকর্তাকে একাধিকবার জিজ্ঞাস করছি তিনি সব ঠিক আছে বলে আমাকে জানিয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষ হবার দুদিন আপনার মাধ্যমে অনিয়মের বিষয়টি জেনেছি । তদন্ত সাপেক্ষে ব্যাবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
আরও পড়ুন:








