শনিবার

১১ জুলাই, ২০২৬ ২৭ আষাঢ়, ১৪৩৩

নির্মাণের আগেই পরামর্শক ব্যয় ২৩১ কোটি, প্রশ্নের মুখে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ জুলাই, ২০২৬ ১৭:৪২

শেয়ার

নির্মাণের আগেই পরামর্শক ব্যয় ২৩১ কোটি, প্রশ্নের মুখে বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেল প্রকল্প
ছবি সংগৃহীত

দুই দশকের প্রতীক্ষার পর বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ দৃশ্যমান অগ্রগতি পেলেও মূল নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। এর মধ্যেই শুধু পরামর্শক (কনসালটেন্সি) খাতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা, যা মূল অনুমোদনের সময়ের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। এ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। অন্যদিকে প্রকল্পের আওতায় বগুড়ার ৫৬টি মৌজার ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় এক হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে এবং চেক বিতরণ শুরু হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেলপথ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে মূল নির্মাণকাজ শুরু না হলেও পরামর্শক ব্যয় ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৩১ কোটি ৭১ লাখ টাকা করার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা জানতে চান কমিশনের কর্মকর্তারা। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে এ ব্যয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা, জমির মূল্য বৃদ্ধি, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, নতুন অবকাঠামো সংযোজন এবং অর্থায়নের ধরন পরিবর্তনের কারণে বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

রেলওয়ে ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া সদর, শাজাহানপুর, শেরপুর ও কাহালু উপজেলার মোট ৪৮১ দশমিক ০৯ একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৫৬টি মৌজার যৌথ তদন্ত, মাঠ জরিপ, মালিকানা যাচাই ও প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। গত ২২ জুন ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এক হাজার ৯৬৯ কোটি ১০ লাখ টাকার বরাদ্দ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পৌঁছায়। বর্তমানে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ করা হচ্ছে।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পি. এম. ইমরুল কায়েস বলেন, সরকারের বরাদ্দ পাওয়া অর্থ আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। স্বচ্ছতার সঙ্গে ভূমি অধিগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।

পরামর্শক ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আর জাহাঙ্গীর মিয়া বলেন, ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী অতিরিক্ত কারিগরি পরামর্শ, নকশা যাচাই ও তদারকির প্রয়োজন হয়েছে। পিইসি সভায় যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু পরামর্শক ব্যয় নয়, দ্বিতীয় সংশোধনীতে বিভিন্ন খাতেই ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই প্রতিটি খাতের যৌক্তিকতা নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত প্রায় ৮৬ দশমিক ২ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ হবে। পাশাপাশি করতোয়া ও ইছামতী নদীর ওপর দুটি বড় সেতু, নতুন স্টেশন, কালভার্ট, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও অন্যান্য রেল অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। এতে উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকার রেলপথের দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমবে এবং যাত্রাসময় তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে।

ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, রেললাইনটি চালু হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য ও শিল্পপণ্য পরিবহনে ব্যয় কমবে, বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

তবে প্রকল্পটির সামনে এখনো ভূমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে রেলওয়ের কাছে জমি হস্তান্তর, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান, ঠিকাদার নিয়োগ এবং পূর্ণাঙ্গ অর্থায়নের চূড়ান্ত অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাকি রয়েছে। অতীতে একাধিকবার সময়সীমা ও ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব ধাপ দ্রুত সম্পন্ন না হলে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, নির্ধারিত জমি দ্রুত বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে হস্তান্তরের লক্ষ্যে আইনানুগ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভূমি অধিগ্রহণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক আর জাহাঙ্গীর মিয়া জানান, জমি বুঝে পাওয়া গেলে দরপত্র আহ্বান এবং মূল নির্মাণকাজ শুরুর প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।



banner close
banner close