বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের আস্থা, শৃঙ্খলা ও গৌরবের প্রতীক। কিন্তু সেই বাহিনীর নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে যদি চলে প্রতারণার জাল, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় এবং ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়, তবে দেশপ্রেমিক এই বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে ঠিক এমনই একাধিক অভিযোগ ঘিরে ছড়িয়েছে চাঞ্চল্য। জীবননগরের পুরন্দপুর গ্রামের বাসিন্দা মশিউর রহমানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া নিয়োগপত্র সরবরাহ, চাকরির নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
অভিযোগে এসব কর্মকাণ্ডে মশিউরের ছেলে নাহিদ হাসান এবং স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির নামও এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাই ছিলেন তাদের মূল লক্ষ্য।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ২০১৬ সালে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর চাকরি হারানোর পর মশিউর রহমান এলাকায় ফিরে চাকরি দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়া শুরু করেন। সেনাবাহিনীর জাল নিয়োগপত্র দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকেই মোটা অঙ্কের অর্থ ইতোমধ্যে হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলা এডিশনের হাতে এসেছে জীবননগরের ধোপাখালী গ্রামের নিশান রহমানসহ কয়েকজনের নামে দেওয়া কথিত নিয়োগপত্র, যেগুলো সরবরাহ করেন মশিউর। পর্যালোচনায় দেখা যায়, একই লেফটেন্যান্ট কর্নেলের নাম ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে সেসব। ভুক্তভোগীদের দাবি, পরে এসব নিয়োগপত্র ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়।
আরও অভিযোগ, ২০২৩ সালের ২৮ জানুয়ারি স্থানীয় ইউপি সদস্যদের উপস্থিতিতে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া চার লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন মশিউর রহমান।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন মুহিত হোসেন ও আরও কয়েকজন। তাদের দাবি, সেনাবাহিনীতে চাকরি দেওয়ার আশ্বাসে টাকা নেওয়া হলেও চাকরি তো দূরের কথা, অর্থও ফেরত পাননি তারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চাকরির প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। জীবননগরের ব্যবসায়ী আকুল মিয়ার দাবি, নিজেকে ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মশিউর কয়েক দফা ফোন করে তাকে ভয়ভীতি দেখান। এ ঘটনায় জীবননগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি খোকন খান জড়িত রয়েছেন বলে জানা যায়।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কাশিপুর গ্রামের ব্যবসায়ী শুকুর সরকারও। তার দাবি, নিজেকে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মশিউর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন তাকে।
বাংলা এডিশনের হাতে এসেছে এমন কয়েকটি কল রেকর্ডও, যেখানে মশিউর রহমান নিজেকে সেনাবাহিনী বা ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে ভয় দেখাচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, নিজ বাসা থেকেই কথিত ভুয়া নিয়োগপত্র তৈরির কাজ পরিচালনা করেন মশিউর। সেনাবাহিনীর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করেও প্রতারণার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
এসব অভিযোগ নিয়ে অভিযুক্ত মশিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন এবং নানাভাবে হুমকি দেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ শুধু কয়েকজন ভুক্তভোগীর ক্ষতির বিষয় নয়, এটি জনবিশ্বাসের সঙ্গেও জড়িত। তাই জাল নিয়োগপত্র, পরিচয় ব্যবহার এবং চাঁদাবাজির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
আরও পড়ুন:


.png)





