টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি চরম আকার ধারণ করায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ১০ উপজেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়নের দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরি ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত।
গত চার দিনে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে রোহিঙ্গাসহ অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার চকরিয়ায় আবারও পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু এবং এক নারী আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুল হান্নান জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত গত ৪৮ ঘণ্টায় জেলায় ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে এবং আগামী কয়েক দিন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
জেলা প্রশাসনের গণবিজ্ঞপ্তিতে পাহাড়ের পাদদেশ, ঢালু এলাকা এবং বন্যাকবলিত নিচু স্থানে বসবাসকারীদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ের মাটি সম্পূর্ণ পানিসিক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন করে বড় ধরনের পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, শত শত ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। তলিয়ে গেছে অসংখ্য গ্রামীণ সড়ক। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একইভাবে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। টানা বর্ষণে সেখানে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরি উপজেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পেকুয়ার রাজাখালী ইউনিয়নের কয়েকটি মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অনেক পরিবারের ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত ত্রাণসামগ্রীর চাহিদা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ঢেউটিনও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
আরও পড়ুন:








