একটি গ্রামের পরিচয় কি শুধু তার নামেই সীমাবদ্ধ? নাকি রঙ, শিল্প আর মানুষের সৃজনশীলতাও একটি গ্রামকে আলাদা পরিচয় এনে দিতে পারে? চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার টিকোইল গ্রাম যেন সেই প্রশ্নেরই উত্তর। রঙ-তুলির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া এই গ্রাম এখন সবার কাছে পরিচিত, আলপনা গ্রাম নামে। দাপ্তরিক নাম টিকোইল হলেও স্থানীয়দের মুখে মুখে এখন এটি আলপনা গ্রাম। গ্রামের একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল এই শিল্পচর্চা। সময়ের সঙ্গে সেই রঙিন ছোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে দেয়াল, উঠোন, বারান্দা আর আঙিনাজুড়ে। যেন পুরো পরিবেশই পরিণত হয়েছে এক জীবন্ত ক্যানভাসে।
গাছের পাতা, মাটি, ফুলসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি রঙে ফুটিয়ে তোলা হয় ফুল, লতা, পাখি আর প্রকৃতির নানা নকশা। শুধু বড়রাই নয়, শিশু-কিশোররাও শিখছে এই শিল্প। ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে আছে এক লোকজ ঐতিহ্য।
তবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে এই শিল্পচর্চা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নিয়মিত সহায়তা না থাকায় ঐতিহ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানাচ্ছে উদ্যোক্তারা।
দেখন বর্মন, উদ্যোক্তা। দেখন বর্মনের পরিবারে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলছে এই আলপনা আঁকার চর্চা। তার মেয়ে জয়া বর্মন বলছেন, জন্মের আগ থেকেই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের পরিবার। এখন, সেই ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্বও নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে তারা।
শুধু স্থানীয়রাই নয়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদেরও মুগ্ধ করছে এই রঙিন গ্রাম। তাদের কাছে এটি যেন খোলা আকাশের নিচে এক শিল্প প্রদর্শনী। অনেকের মতে, সঠিক পরিকল্পনা আর সংরক্ষণ হলে টিকোইল হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র।
বিষয়টি নিয়ে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা রাজিয়া বলেন, টিকোইলের আলপনা চর্চা শুধু একটি গ্রামের সৌন্দর্য নয়, এটি দেশের লোকজ সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উদ্যোগ স্থানীয় নারীদের সৃজনশীলতা তুলে ধরার পাশাপাশি গ্রামীণ পর্যটনেরও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
সুলতানা রাজিয়া, ইউএনও, নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি আলপনা, প্রতিটি রঙ যেন বলে শত বছরের লোকজ ঐতিহ্যের গল্প। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের অনেক সংস্কৃতি, তখন টিকোইলের এই শিল্পচর্চারঙ-তুলিতে জীবন্ত টিকোইল আলপনা গ্রামএখনও ধরে রেখেছে বাংলার শিকড়ের সৌন্দর্য। এখন, স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে আলপনা গ্রাম শুধু নাচোলের নয়, হয়ে উঠুক বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আরও পড়ুন:





.jpg)


