চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীর দেখা পাননি অনেকে। কোথাও বন্ধ ছিল কমিউনিটি ক্লিনিক, কোথাও আবার জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যত অচল। অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে বিদায় সংবর্ধনা, ভুরিভোজ ও আনন্দ ভ্রমণে ব্যস্ত ছিলেন মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এর ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ৩৩টি কমিউনিটি ক্লিনিকের নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজারো রোগী, গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা ও শিশুরা।
স্থানীয় সূত্র, স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৩ জুন কসবা উপজেলায় মাসিক সমন্বয় সভা ও মাঠ পর্যায়ে ইপিআই এবং কমিউনিটি ক্লিনিক তদারকির কথা থাকলেও দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ফুলেল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোশারফ হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম, নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম এবং সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. জসিম। এ ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর এক সপ্তাহ পর ২০ জুন একই ধরনের অভিযোগ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। অভিযোগ অনুযায়ী, সদর উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইপিআই কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোশারফ হোসেন, কামাল উদ্দিন, অবসরপ্রাপ্ত মনিরুল ইসলাম এবং এমটিপিআই প্রদোষ কান্তি দাস সরকারি দায়িত্ব ফেলে সিলেটের সাদা পাথর এলাকায় আনন্দ ভ্রমণে যান।
একই সময়ে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে বদলিজনিত কারণে ডা. ইসমাইল হোসেন রাহাত এবং অবসরজনিত কারণে মো. মনির হোসেন ও বশির আহমেদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৩৩ জন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি), ৪৫ জন স্বাস্থ্য সহকারী এবং নবীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুইজন কর্মী নিজ নিজ কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, একযোগে বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ কমিউনিটি ক্লিনিক কার্যত অচল হয়ে পড়ে। সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া, আমাশয়সহ সাধারণ রোগে আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসাসেবা পাননি। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েন গর্ভবতী নারী, প্রসূতি মা ও শিশুরা। পাশাপাশি সরকারিভাবে সরবরাহ করা ২৮ ধরনের বিনামূল্যের ওষুধ বিতরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তড়িঘড়ি করে ২০২৫ সালের একটি পুরোনো ব্যানার টাঙিয়ে সেটিকে মাসিক সমন্বয় সভা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠান ও ভুরিভোজে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এই অর্থ কোথা থেকে এসেছে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে প্রভাব বজায় রাখার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অতীতে তারা ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, আর বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ছবি ও ফটোসেশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রামাণ্য নথি এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরকারি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সাদা প্রাইভেট কার সরকারি গ্যারেজে রাখা হয় এবং একই চালক দুটি গাড়ি পরিচালনা করেন। সরকারি গাড়িটি অনুমোদনের বাইরে বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
অন্যদিকে এলপিআরে (লিভ প্রিপারেটরি টু রিটায়ারমেন্ট) থাকা কর্মচারী মো. মনির হোসেন নিয়মিত অফিসে এসে বিভিন্ন প্রশাসনিক বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "এলপিআরে থাকা কর্মকর্তা দীর্ঘদিন এখানে চাকরি করেছেন। তিনি অফিসে আসতে পারেন, তবে কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর সুযোগ নেই।"
অনুষ্ঠানের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাসিক সভায় মাঠকর্মীদের উৎসাহ দিতে মাঝে মাঝে সামান্য খাবারের আয়োজন করা হয়। এর খরচ আমরা চিকিৎসকরা নিজেরাই বহন করেছি।
মাঠ পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকরা আমার নির্দেশ ছাড়া অন্য কোথাও যেতে পারেন না। আমার জানা মতে ডিউটির সময়ে তারা দায়িত্বে অবহেলা করেননি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি গাড়ির ব্যবহার সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, গাড়িটি কেবল সরকারি কাজেই ব্যবহৃত হয় এবং অনিয়মের অভিযোগ সঠিক নয়।
তবে একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী মানুষের প্রশ্ন, যদি মাঠ পর্যায়ের সব স্বাস্থ্যকর্মী দায়িত্বে থাকেন, তাহলে নির্ধারিত দিনে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হলো কেন? সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকে মানুষ বঞ্চিত হওয়ার দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
আরও পড়ুন:




.jpg)



