চিকিৎসার নামে ভয়ংকর প্রতারণার অভিযোগ। বৈধ সনদ ছাড়াই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সেজে জালিয়াতি। ভুয়া চিকিৎসকের কাণ্ড। অভিযোগের তদন্তে অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য প্রমাণিত; আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস।
বিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগে এসেও, শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে এক অভিনব ও ভয়ঙ্কর প্রতারণার জাল বিছিয়ে বসেছেন রিয়াজ উদ্দিন নামের এক কথিত মহৌষধ বিক্রেতা। কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা, চিকিৎসকের ডিগ্রি কিংবা বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই নালিতাবাড়ী উপজেলার নয়াবিল বাজারের পাশে নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছেন এক এলাহী কারবার। সেখানে ক্যানসার, প্যারালাইসিস থেকে শুরু করে এমন কোনো রোগ নেই যার ওষুধ মেলে না। একাধারে নিজেকে কবিরাজ, ডাক্তার ও ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে সমাজে পরিচিত করেছেন এই কথিত চিকিৎসক।
দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এই প্রতারণার ব্যবসা চালিয়ে আসলেও, এতদিন তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে, সম্প্রতি সচেতন মহলের তীব্র ক্ষোভ এবং স্বাস্থ্য বিভাগের নজরে আসায় এই চিকিৎসকের থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়তে শুরু করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুয়া চিকিৎসক রিয়াজ উদ্দিনের চেম্বারে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন সরলসোজা গ্রামীণ রোগী ভিড় করে। তিনি একই সাথে অ্যালোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদিক, কবিরাজি ও মালিশসহ সব ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতি একাই প্রয়োগ করেন। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে একজন মানুষের পক্ষে একইসাথে এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসায় পারদর্শী হওয়া অসম্ভব বলে মত বিশ্লেষকদের। কিন্তু, রিয়াজ উদ্দিন কৌশলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে রিয়াজ উদ্দিন বাংলা এডিশনকে বলেন, ১৪ বছর ধরে তিনি এই চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। এতে মানুষের উপকার হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে, যখন তার কাছে শিক্ষাগত যোগ্যতা বা চিকিৎসার বৈধ সার্টিফিকেট দেখতে চাওয়া হয়, তখন তিনি হোমিওপ্যাথি কলেজের একটি নথি প্রদর্শন করেন। কিন্তু, ভালো করে যাচাই করে দেখা যায়, সেটি কোনো চিকিৎসকের পাসের সার্টিফিকেট নয়, বরং একটি সাধারণ ভর্তি ফরম মাত্র। তবে, সেটিও মেয়ের ভর্তি ফরম দিয়ে নিজের বৈধতা প্রমাণের অপচেষ্টা।
প্রতারণার গভীরতা এখানেই শেষ নয়। জানা গেছে, রিয়াজ উদ্দিনের মেয়ে রিপা আক্তার শেরপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আতিউর রহমান মডেল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়েছেন। মেয়ের সেই ভর্তির ফরম ও রসিদ দেখিয়েই রিয়াজ উদ্দিন চিকিৎসক হিসেবে জাহির করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
এই বিষয়ে ওই মেডিকেল কলেজের প্রধান শিক্ষক ডাঃ মোঃ আজিজুর রহমান বাংলা এডিশনকে স্পষ্ট করে বলেন, চার বছর মেয়াদী কোর্স পাস করার পর, আরও ৬ মাস শিক্ষানবিশ সফলভাবে সম্পন্ন করতে হয়। এরপর বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ড থেকে অফিশিয়াল রেজিস্ট্রেশন সনদ পাওয়ার পরেই কেবল একজন ব্যক্তি চিকিৎসা দিতে পারবেন। এর আগে কোনো ধরনের চিকিৎসা করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
অন্যদিকে, শেরপুরের সিভিল সার্জন ডাঃ মুহাম্মদ শাহীন সর্বরোগের মহৌষধের নামে চলমান প্রতারণা নিয়ে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, কোনো ব্যক্তিগত বাসভবনে বা অবৈজ্ঞানিক উপায়ে এভাবে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করার অধিকার বা আইনি সুযোগ কারো নেই। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যেই বিষয়টি তদন্তের জন্য পরিদর্শন করেছেন। সেখানে, অবৈধ ওষুধ, থেরাপির সরঞ্জামসহ অনেক কিছুর প্রমাণ মিলেছে। তাকে তাৎক্ষণিক সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন এই কর্মকর্তা।
একই বিষয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ জুনায়েদ আব্দুল কাইয়ূম জানান, তিনিও প্রতারণা সম্বন্ধে অবগত। ওই চিকিৎসকের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এই অবস্থায়, রোগীদের ধোঁকা দেয়ায় তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।
শেরপুরের সুশীল সমাজ ও সচেতন মহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে, প্রশাসনের চোখের সামনে ১৪ বছর ধরে এই মানবতাবিরোধী অপরাধ কীভাবে চলছে, তা ভাববার বিষয়। এই লাগামহীন প্রতারণা এখনই টেনে না ধরলে অবুঝ ও সাধারণ মানুষ অকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। রিয়াজ উদ্দিনকে ভুয়া চিকিৎসক দাবি করে, তার চেম্বার সিলগালা করে দেয়ার দাবি এলাকাবাসীর।
আরও পড়ুন:








