সোমবার

৬ জুলাই, ২০২৬ ২১ আষাঢ়, ১৪৩৩

সরকারি জমি দখল ও অপরাধের স্বর্গরাজ্য গড়েছেন বেপরোয়া ইউপি চেয়ারম্যান

জাকির শামীম, বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৫ জুলাই, ২০২৬ ২৩:৩২

শেয়ার

সরকারি জমি দখল ও অপরাধের স্বর্গরাজ্য গড়েছেন বেপরোয়া ইউপি চেয়ারম্যান
ছবি সংগৃহীত

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ওরফে গ্রেনেড বাবুর বিরুদ্ধে সরকারি খাস জমি দখল, খাস পুকুর ভরাট এবং সরকারি প্রকল্পের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসন প্রায় ১৫ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগ তদন্ত শুরু করেছে।

অভিযোগ রয়েছে যে, শুধু সরকারি জমি দখল নয়, হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের সরকারি অর্থ ব্যবহার করে একটি খাস পুকুর ভরাট করা হয়েছে। এরপর সেখানে মিনি পার্ক, কবুতরের খামার এবং ব্যক্তিগত স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে।

উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্য অনুসারে, কিশোরগঞ্জ বাজারের খাস খতিয়ানের অন্তত ৪০ শতাংশ সরকারি জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রধান সড়কের পাশের মূল্যবান সরকারি জমি ও ভেতরের পুকুর ভরাট করে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পুকুর ভরাটের পর থেকেই বাজারে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। হাটের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই হাট এবার ইজারা হয়নি। এতে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা ভোগান্তিতে পড়েছেন এবং সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম বলেন, পুকুর দখল করে স্থাপনা নির্মাণের কারণে জলাবদ্ধতা বেড়েছে। দিন দিন ক্রেতার সংখ্যা কমছে।

অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব জায়গায়ও অবৈধভাবে চারটি দোকান নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিটি দোকান বরাদ্দের নামে আড়াই লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। পরে মাসে দুই হাজার টাকা করে ভাড়া আদায় করা হলেও সেই অর্থের কোনো হিসাব ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি তহবিলে নেই বলে জানিয়েছেন খোদ ইউপি সচিব।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তুলেছেন চেয়ারম্যান। নিরাপত্তার শঙ্কায় এতদিন কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি।

সরকারি অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে হাট-বাজার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় গরুর হাটে মাটি ভরাট ও গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য তিনটি প্রকল্পে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, সেই অর্থ হাটের উন্নয়নে ব্যয় না করে চেয়ারম্যান নিজের দখলে থাকা পুকুরপাড়ের গাইড ওয়াল ও ব্যক্তিগত কার্যালয় নির্মাণে ব্যবহার করেছেন।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট জায়গাটি সরকারি বলে স্বীকার করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। কেন সেখানে স্থাপনা গড়ে উঠেছে, সে বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে গত ১০ জুন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। ইতোমধ্যে কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

ইউএনও আরিফুর রহমান এবং জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারি খাস জমি দখল, সরকারি অর্থের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজন জনপ্রতিনিধি। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পর অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই লক্ষ্য স্থানীয়দের।



banner close
banner close