সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নওয়া গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি পদটি যেন রূপ নিয়েছে একটি নির্দিষ্ট পরিবারের ‘জমিদারি’তে! বিগত ২৩ বছর ধরে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদটি দখলে রাখার পর, এবারো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবারো সভাপতি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও নন্দিরগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান কামরুল হাসান আমিরুল। আর এই অনৈতিক মিশনে তার সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে খোদ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা পারভীন বেগমের বিরুদ্ধে।
গত ১৬/০৩/২০২৬ ইং তারিখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত নীতিমালার ১.৩ ধারা অনুযায়ী—প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যুৎসাহী সদস্য হতে হলে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে তার সন্তান অধ্যয়নরত থাকতে হবে। অথচ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চেয়ারম্যান আমিরুলের কোনো সন্তানই নওয়া গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে না।
প্রধান শিক্ষিকা পারভীন বেগম ও কিছু সুবিধাভোগী মহলের অনৈতিক যোগসাজশে ভুয়া অভিভাবক সাজিয়ে আমিরুলের নাম ‘পুরুষ বিদ্যুৎসাহী সদস্য’ হিসেবে প্রস্তাব করে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর তালিকা প্রেরণ করা হয়েছে। মূলত এই সদস্য পদের আড়ালেই লুকিয়ে আছে আবারো সভাপতি হওয়ার নীল নকশা।
আইন অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হতে হলে স্নাতক (পাস) শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এলাকায় সর্বজনবিদিত যে, চেয়ারম্যান আমিরুলের স্নাতক পাসের সার্টিফিকেটের কোনো গ্রহণযোগ্য ভিত্তি নেই। এই প্রশ্নবিদ্ধ সার্টিফিকেট দিয়েই তিনি একের পর এক বিদ্যালয়ের সভাপতি পদ বাগিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত একাধারে ২৩ বছর নিয়মবহির্ভূতভাবে এই বিদ্যালয়ের সভাপতি ছিলেন আমিরুল। তার আগে তার বড় ভাই মরহুম নুরুজ্জামানও একই পদে ছিলেন। ফলে নওয়া গাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন তাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি প্রভাব খাটিয়ে ও সিন্ডিকেট তৈরি করে পার্শ্ববর্তী ‘দশ গাঁও নওয়া গাঁও উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ’-এরও এডহক কমিটির সভাপতি পদ দখল করেছেন তিনি, যা নিয়ে গত ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখে 'দৈনিক সিলেটের সংবাদ' পত্রিকায় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়।
বিগত ২৩ বছর আমিরুল সভাপতি থাকাকালীন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বিদ্যালয়ের প্রস্তাবিত নতুন কমিটি কীভাবে গঠিত হলো, তা এলাকার প্রায় ৯০% অভিভাবকই জানেন না। কাউকে কোনো চিঠি বা সভার মাধ্যমে জানানো হয়নি। ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় বহু যোগ্য ও উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন বারবার বিতর্কিত আমিরুলকেই বেছে নেয়া হচ্ছে, তা নিয়ে এলাকাবাসীর মনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ছাত্র-জনতার ওপর হামলার মামলার আসামি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চেয়ারম্যান কামরুল হাসান আমিরুল কেবল অনিয়মেই সিদ্ধহস্ত নন, তিনি একজন দাগী মামলার আসামিও বটে। গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে সালুটিকর ডিগ্রি কলেজের সভাপতি থাকাকালীন ছাত্র-জনতার ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার অন্যতম ‘হুকুমদাতা’ আসামি তিনি (গোয়াইনঘাট জিআর মামলা নং- ২০৫/২৪)। এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রায় আড়াই মাস জেল খেটে জামিনে বের হয়েছেন তিনি, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এছাড়া জমি দখল, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দেশের পটপরিবর্তন হওয়ার পরেও একজন একাধিক মামলার আসামি, স্বৈরাচারের দোসর ও দুর্নীতিগ্রস্ত চেয়ারম্যান কীভাবে এখনো এতটা দাপট দেখিয়ে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গিলে খাচ্ছেন? তার এই খুঁটির জোর কোথায়?
সচেতন মহলের দাবি অনতিবিলম্বে এই ভুয়া ও পকেট কমিটি বাতিল করে তদন্ত সাপেক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিলেটের জেলা শিক্ষা অফিসার, গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার, ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
আরও পড়ুন:








