নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনের ঘটনার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার রায় এখনো কার্যকর হয়নি। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, আপিল ও আইনি জটিলতার কারণে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করা হয়। এর তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, ওই দিন দুপুরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার চার সহযোগী। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় পৌঁছালে সাদাপোশাকে থাকা একটি দল তাদের গাড়ির গতি রোধ করে তুলে নিয়ে যায়। একই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ভিডিও করার চেষ্টা করলে তাকে ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকেও অপহরণ করা হয়। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের এবং পরদিন আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে নিহতদের মাথায় আঘাত ও শ্বাসরোধে হত্যার প্রমাণ পাওয়া যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল পৃথক দুটি মামলা করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৫ সালে ৩৫ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করেন। পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে আপিল করা হলে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং অন্যদের সাজা পরিবর্তন করা হয়। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল পর্যায়ে রয়েছে।
মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ, আরিফ হোসেন ও এম মাসুদ রানা। এ ছাড়া হাবিলদার মো. এমদাদুল হক, এবি মো. আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হিরা মিয়া, ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব আলী, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, সৈনিক আবদুল আলিম, সৈনিক মহিউদ্দিন মুনশি, সৈনিক আল আমিন ও সৈনিক তাজুল ইসলামের সাজা বহাল রয়েছে। অন্যদিকে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সার্জেন্ট এনামুল কবির ও নূর হোসেনের সহযোগীরা।
নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি জানান, ১২ বছর ধরে তারা বিচার প্রত্যাশা করছেন। আদালতের রায় হলেও তা কার্যকর না হওয়ায় তারা হতাশ। তিনি দ্রুত দোষীদের ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানান।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মামলার অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে রয়েছে। দ্রুত শুনানির জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তিনি সাত খুনের শিকার পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান।
নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির জানান, মামলাটি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সরকার ও বিচার বিভাগ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে তারা আশাবাদী। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত এই ঘটনার চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা।
আরও পড়ুন:








