শুক্রবার

৩ জুলাই, ২০২৬ ১৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

ফের উত্তপ্ত মিয়ানমার সীমান্ত, বিস্ফোরণের শব্দে টেকনাফে আতঙ্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ জুলাই, ২০২৬ ১০:৪১

শেয়ার

ফের উত্তপ্ত মিয়ানমার সীমান্ত, বিস্ফোরণের শব্দে টেকনাফে আতঙ্ক
ছবি সংগৃহীত

এক বছরেরও বেশি সময় পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার নাফ নদের পূর্ব ও দক্ষিণাংশে সীমান্তের ওপার থেকে দফায় দফায় বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির বিকট শব্দ ভেসে আসছে। এতে সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনবরত বিস্ফোরণের শব্দে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যেতে ভয় পাচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও নেটংপাড়া সীমান্ত এলাকা ঘুরে থমথমে পরিস্থিতি দেখা গেছে। সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় জেলেরা সতর্কতার সঙ্গে নাফ নদে মাছ ধরছেন। সীমান্তজুড়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডের অতিরিক্ত টহলও লক্ষ্য করা গেছে।

সীমান্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তে (আকিয়াব) থেকে উড়ে আসা মিয়ানমারের যুদ্ধবিমান প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের মংডু এলাকায় আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। প্রতিবার পাঁচ থেকে ছয়টি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এসব বিস্ফোরণের অভিঘাতে নাফ নদের এপারের ঘরবাড়িও কেঁপে উঠছে।

টেকনাফ পৌরসভার বাসিন্দা হাফেজ এনামুল হাসান বলেন, রাত থেকে থেমে থেমে বিকট বিস্ফোরণের শব্দে মাটি কেঁপে উঠছে। পাশাপাশি মুহুর্মুহু গোলাগুলির শব্দও শোনা যাচ্ছে। এতে সীমান্তের বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

শাহপরীর দ্বীপের সাবরাং এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানান, হঠাৎ তীব্র ঝাঁকুনি অনুভব করে প্রথমে ভূমিকম্প হয়েছে বলে মনে হয়েছিল। পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদের ওপারে আগুনের লেলিহান শিখাও দেখা যায়। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, বিস্ফোরণটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঘটেছে।

এর আগে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সংঘর্ষে মর্টারশেল বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির শব্দে উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত কেঁপে উঠেছিল। দীর্ঘ বিরতির পর আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন রাখাইনে আবারও বিমান হামলা শুরু করেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। বৃহস্পতিবার সকালে বুথিডং এলাকাতেও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে।

সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপ এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, রাত থেকে ভোর পর্যন্ত সীমান্তের ওপার থেকে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। মাঝেমধ্যে বিকট বিস্ফোরণে মাটি কেঁপে উঠেছে।

সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবুল ফয়েজ বলেন, নাফ নদের পূর্ব ও দক্ষিণাংশের ওপারে রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের আশপাশে মেগিচং, কাদিরবিল, নুরুল্লাহপাড়া, মাংগালা, নল বন্ন্যা, ফাদংচা ও হাসুরাতা এলাকায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) কয়েকটি নিরাপত্তাচৌকি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই চৌকিগুলোকে লক্ষ্য করেই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলা চলছে।

তিনি আরও বলেন, পরশু রাত থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত মংডু শহরের আশপাশে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা গেলেও সকালে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল। তবে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। সংঘাত আরও তীব্র হলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা শুরু হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

টেকনাফের নয়াপাড়া রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের নেতা মো. জামাল হোসেন জানান, স্থলপথে আরাকান আর্মির সঙ্গে তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষ চলছে। এতে বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা করেন।

উখিয়া-টেকনাফ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, বুধবার রাতে মংডু শহরের আশপাশে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা গেলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত। এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় উল্লেখ করে তিনি সীমান্তবর্তী জেলেদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও গোলাগুলির খবর পেয়েছে বিজিবি। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে দুটি পক্ষের সংঘর্ষের কারণে কয়েক দিন ধরে এসব শব্দ শোনা যাচ্ছে। সীমান্তে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে এবং সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, শাহপরীর দ্বীপ থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘর্ষ চলছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদে অতিরিক্ত টহল দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত সীমান্তে কোনো গুলি এসে পড়া বা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেনি।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত। পরিস্থিতির কারণে বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানো হয়েছে। সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর টানা ১১ মাসের যুদ্ধের পর আরাকান আর্মি মংডু, বুথিডং, রাথেডংসহ রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে রাজধানী সিত্তে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্ত সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক বিমান হামলাগুলো সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে।

এদিকে মিয়ানমারভিত্তিক কয়েকটি গণমাধ্যম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বুথিডং টাউনশিপের একটি মুসলিম গ্রামে বিমান হামলায় হতাহতের পাশাপাশি অন্তত ১০টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে ১৭ ও ২৪ জুন মংডু ও কিয়াউকতাও এলাকায় পৃথক বিমান হামলায়ও বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটে।



banner close
banner close