ফেনীর পরশুরাম উপজেলার সীমান্তজুড়ে চোরাচালান কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতের পাশাপাশি এখন দিনের বেলাতেও উপজেলার অন্তত ৫০টির বেশি সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, সীমিত জনবল নিয়েও তারা নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি ভারতীয় চিনি প্রবেশ করত। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চিনি পাচার অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা, প্রসাধনসামগ্রী, ইলেকট্রনিকস পণ্য, মোবাইল যন্ত্রাংশ, গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ ও ওষুধের চোরাচালান বেড়েছে বলে দাবি করেন তারা।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, সীমান্তসংলগ্ন বাড়ি বা গোপন স্থানে প্রথমে এসব পণ্য মজুত করা হয়। পরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও মিনি ট্রাকে করে ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। তাদের দাবি, রাতের বেলায় সীমান্ত সড়কে সন্দেহজনক যানবাহনের চলাচলও বৃদ্ধি পায়। এছাড়া কাঁটাতারের ওপার থেকে ছোট ছোট বান্ডিল ছুড়ে দিয়ে এপারে অবস্থানকারীরা তা সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বিলোনিয়া, নিজ কালিকাপুরের মুহুরী নদী, মুহুরীরচর, বাঁশপদুয়া, নরনীয়া, রাজষপুর, মির্জানগর ইউনিয়নের সত্যনগর, মধুগ্রাম, বীরচন্দ্রনগর, মহেশপুষ্করণী এবং সিলোনিয়া নদীপথসহ বিভিন্ন এলাকা চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্ষাকালে ড্রাম বা জলরোধী পলিথিনে পণ্য ভাসিয়ে এবং শুষ্ক মৌসুমে চর ও ঝোপঝাড় ব্যবহার করে সীমান্ত পারাপারের অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, চোরাচালান কার্যক্রমে কয়েকটি ধাপে আলাদা আলাদা গ্রুপ কাজ করে। একটি গ্রুপ ভারত থেকে পণ্যের অর্ডার ও সংগ্রহের ব্যবস্থা করে, অন্যটি অর্থ পরিশোধ ও নিরাপত্তার বিষয়টি সমন্বয় করে এবং আরেকটি গ্রুপ দেশের অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পণ্য পৌঁছে দেয়।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি চোরাই পণ্যের গাঁইটের ওজন সাধারণত ৫০ থেকে ৫৫ কেজি হয়ে থাকে। সীমান্ত থেকে পরশুরাম পর্যন্ত একটি গাঁইট বহনের জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। পরে এসব পণ্যের বড় অংশ চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। চোরাই মালামাল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে জব্দ হলে সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে স্থানীয় কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে। তবে এসব তথ্যের স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাচালানে কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের সঙ্গে চোরাকারবারিদের সখ্যের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং অভিযুক্তদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত পরশুরাম উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় কেতরাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার ভবেশ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, সীমান্তে বিজিবির টহল জোরদার রয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারণে কিছু ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, "আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করছি। সীমান্ত এলাকায় মাদকের সমস্যাও প্রকট আকার ধারণ করেছে।"
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) পরশুরাম উপজেলা কমিটির সভাপতি ইউসুফ বকুল বলেন, চোরাচালান প্রতিরোধে শুধু বাহিনীর টহল বাড়ালেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িত মূল অর্থদাতা ও স্থানীয় সিন্ডিকেট পরিচালনাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
ফেনী ৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এম জিল্লুর রহমান বলেন, "সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশইন এবং চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।"
আরও পড়ুন:








