সেবা শব্দটি শুনলেই মানুষের কল্যাণ, আস্থা ও নির্ভরতার কথা মনে আসে। আধুনিক বিশ্বে টেলিযোগাযোগ সেবা এমন এক মাধ্যম, যা ভৌগোলিক দূরত্বকে অনেকটাই অর্থহীন করে তুলেছে। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত, এমনকি বিশ্বের এক দেশ থেকে অন্য দেশে থাকা মানুষও এই সেবার মাধ্যমে মুহূর্তেই যুক্ত হতে পারছে প্রিয়জনের সঙ্গে।
বাংলাদেশের লাখো প্রবাসী প্রতিদিন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ফলে, টেলিযোগাযোগ সেবা আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু সেই সেবাকে ঘিরেই যখন প্রশ্ন ওঠে, অভিযোগ জমতে শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয় গ্রাহকদের মধ্যে। দেশের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটরগুলোর একটি গ্রামীণফোনকে ঘিরে সম্প্রতি এমনই নানা অভিযোগ ও অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন গ্রাহক, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্যে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্যাকেজের মেয়াদ নির্ধারণ, অব্যবহৃত ডাটা ও মিনিটের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া, তুলনামূলক উচ্চ কলরেট, কল ড্রপ, জরুরি ব্যালেন্স সেবার চার্জ, ইন্টারনেট প্যাকেজ শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত অর্থ কেটে নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
গ্রাহকরা বলছেন, বাজারের অন্যান্য মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে তুলনা করলে গ্রামীণফোনের কলরেটই সর্বোচ্চ। প্রতি সেকেন্ডে ০.৫ পয়সা বা ১ পয়সা কলরেটের বিভিন্ন অফারের প্রচারণা চালানো হলেও, মিনিট হিসেবে হিসাব করলে গ্রাহকদের প্রায় ২ টাকা ৭৫ পয়সা পর্যন্ত কলরেট গুনতে হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত কল খরচ সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে অনেক গ্রাহক প্রতারিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছে ভোক্তাদের একটি অংশ।
এছাড়াও, অভিযোগ রয়েছে যে, গ্রাহকরা নিজেদের অর্থ ব্যয় করে প্যাকেজ কিনলেও অপারেটর নির্দিষ্ট সময়সীমা-৭ দিন, ১৫ দিন কিংবা ৩০ দিনের মধ্যে সেটি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। ফলে, অনেক সময় প্যাকেজে অব্যবহৃত ডাটা বা মিনিট থাকা সত্ত্বেও মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি ভোক্তা অধিকারের পরিপন্থী। কারণ, একজন ভোক্তা তার ক্রয়কৃত সেবা কতদিন ব্যবহার করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তারই থাকা উচিত। কোনো অপারেটর একতরফাভাবে সেই সীমা নির্ধারণ করে দিতে পারে না। তাই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে গত ২৫ জুন নোয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একজন গ্রাহক এক মাসের জন্য এক হাজার টাকার ইন্টারনেট প্যাকেজ কিনলেও মেয়াদ শেষে যদি ৪০০ বা ৫০০ টাকার সমপরিমাণ ডাটা অব্যবহৃত থাকে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপারেটরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তিনি এটিকে গ্রাহকদের প্রতি অন্যায্য আচরণ বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে, গ্রামীণফোনের মালিকানা কাঠামো নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। কারণ, গ্রামীণফোন একটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান হলেও এর প্রধান বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদার হলো নরওয়েভিত্তিক টেলিযোগাযোগ কোম্পানি টেলিনর, যার হাতে রয়েছে কোম্পানিটির ৫৫.৮ শতাংশ শেয়ার। সে হিসেবে গ্রামীণফোনের অর্জিত মুনাফার একটি অংশ বিদেশে যায়। অভিযোগকারীদের মতে, কোম্পানিটির প্রধান অংশীদার বিদেশি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় দেশের গ্রাহকদের ব্যয় করা অর্থের একটি অংশ প্রতিবছর দেশের বাইরে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এ কারণে দেশের সম্পদ দেশের ভেতরেই ধরে রাখতে দেশীয় অপারেটর ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন গ্রাহকদের একটি অংশ।
অন্যদিকে শ্রমিকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বকেয়া পাওনা, চাকরিচ্যুতি এবং শ্রম অধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি শ্রমিকদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এখনো বিভিন্ন বকেয়া পাওনা পরিশোধের বিষয়টি ঝুলে রয়েছে। পাশাপাশি, ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন দমনে শ্রমিকদের হয়রানি করতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।
নরওয়ে থেকে পরিচালিত একটি বিদেশি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে দেশের আইন, শ্রমিক অধিকার ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে এত সমালোচনার মুখেও কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে? এর উত্তর খুঁজতে হলে গ্রামীণফোনের অতীত ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দিকেও নজর দিতে হবে বলে মনে করছেন তারা।
একইভাবে, গ্রামীণফোনে অসংখ্য ভারতীয় কর্মীদের চাকরি করার নজিরও রয়েছে। যা নিয়েও রয়েছে তুমুল সমালোচনা। প্রতিষ্ঠানটিতে বিদেশি নাগরিকদের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৯ সালের পর থেকে। ২০১২ সালের জুলাই মাসে এক দফায় ২১৮ জন কর্মী চাকরিচ্যুত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে সময়ের বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকরা। তাদের অভিযোগ, ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদগুলোতে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের সংখ্যা কমে আসে।
গ্রামীণফোনের এসব তৎপরতা যে রাজনৈতিক কারণে করা হয়েছে তার জ্বলন্ত উদাহরণ আলী আহসান মুজাহিদের ছেলে আলী আহমেদ তাহকিকের চাকরিচ্যুতি। গ্রামীণফোনে বেস্ট ইমপ্লয়ী অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত তাহকিককে শুধুমাত্র জামায়াত নেতার ছেলে হওয়ার কারণে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে অন্যায়ভাবে যেদিন শহীদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়, ওই রাতেই চাকরিচ্যুত করা হয় মুজাহিদপুত্র তাহকিককে।
ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার আমলে গ্রামীণফোনে চাকরি করেছে বেশ কয়েকজন ভারতীয় নাগরিক। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত গ্রামীণফোনে সিইও হিসেবে চাকরি করেছেন ভারতের রাজিব শেঠি। এছাড়া, বিভিন্ন সময়ে ভারতীয়দের মধ্যে গ্রামীণফোনে ছিলেন, ২০১৮ সালে হেড অব প্রোডাক্ট হিসেবে সৌরভ প্রকাশ, সাবেক সিএফও হিসেবে ছিলেন দিলিপ কুমার, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সিইও ভিভেক স্যুড। একইভাবে নানা সময়ে যুগেশ মালিক, ভৈভব নিকতে, হিতেশ স্যুড, সরবজিৎ সিং, রভীন্দ্রসহ অনেক ভারতীয় শীর্ষ পদে কর্মরত ছিলেন গ্রামীণফোনে। স্বৈরাচারের পতনের পরেও শীর্ষ প্রায় সব পদসহ গ্রামীণফোনে বর্তমানে কমপক্ষে ১০০ ভারতীয় নাগরিক কর্মরত আছেন।
এসব ভারতীয় নাগরিকেরা অবৈধভাবে বাংলাদেশে কাজ করায় বাংলাদেশ শুধু যে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়। জাতীয় নিরাপত্তা, শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে ভারতে পাচারের অভিযোগও উঠেছে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে। যা দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিক নিরাপত্তার জন্য গভীর হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন:








