ঢাকার সাভারে চাঁদাবাজি, অটোরিকশা লুট, হামলা, নারী লাঞ্ছনা, কিশোর অপহরণ ও নির্যাতনের পৃথক দুই মামলায় সাভার থানার সদ্য বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা মাহাবুব হোসেন সামির ওরফে ফেন্সি সামিরসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। তবে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ও মামলা দায়ের হলেও প্রধান অভিযুক্ত মাহাবুব হোসেন সামির এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকাজুড়ে ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রাজাশন আমতলা এলাকার বাসিন্দা লাবনী বেগম গত ১২ জুন রাতে সাভার মডেল থানায় একটি লিখিত এজাহার দাখিল করেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, তার খালাতো ভাই শামীম রেজার কাছে ৩০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন মাহাবুব হোসেন সামির। চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় গত ২৪ মে, ২৭ মে, ৮ জুন ও ১২ জুন দফায় দফায় সশস্ত্র সহযোগীদের নিয়ে শামীম রেজার রিকশা গ্যারেজে হামলা চালিয়ে মোট ২৩টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয়, যার আনুমানিক মূল্য অর্ধকোটি টাকারও বেশি।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়, হামলার সময় গ্যারেজের ক্যাশবাক্স থেকে নগদ ৯০ হাজার টাকা এবং বাড়ির ওয়ারড্রোব থেকে ৪ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া বসতবাড়িতে ভাঙচুর করে নগদ ক্ষয়ক্ষতি সাধন করা হয়।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ১২ জুন রাতে অভিযুক্তরা পুনরায় শামীম রেজার বাড়িতে হামলা চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের মারধর করে। শামীম রেজার খালাতো বোনের স্বামী একরামুল হককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। শামীম রেজার প্রবাসী ছোট ভাইয়ের স্ত্রী বন্যা বেগমকে মারধর ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে। এ সময় শামীম রেজার ভাতিজি দুই বছরের শিশু কন্যা সায়মাকেও আছড়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার সময় এক ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের চেইনও ছিনিয়ে নেয় হামলাকারীরা।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, লিখিত এজাহারটি ১২ জুন রাতে থানায় জমা দেওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে মামলা নেয়নি পুলিশ। তাদের দাবি, সাভার মডেল থানার এসআই মো. নেয়ামত উল্লাহর পরোক্ষ প্রভাব ও মদদের কারণেই দীর্ঘ সময় মামলা গ্রহণে গড়িমসি করা হয়। লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর মামলা না নেওয়ার সুযোগে গত ১৬ জুন অভিযুক্তরা আবারও শামীম রেজার গ্যারেজ থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকার ব্যাটারি ও ৬ লাখ টাকা মূল্যের একটি মোটরসাইকেল নিয়ে যায় মাহাবুব হোসেন সামির তার লোকজন।
এ ঘটনাগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা ও তদারকির পর এজাহার দায়েরের ১২ দিন পর মাহাবুব হোসেন সামির ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা রেকর্ড করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
এদিকে, অটোরিকশা লুটের ঘটনায় মামলার একদিন পর সাভার মডেল থানায় রিপন ঋষি নামে এক সনাতন ধর্মাবলম্বী কিশোরকে অপহরণ ও পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগে মাহাবুব হোসেন সামিরসহ অন্যদের বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা দায়ের হয়।
পরপর দুটি গুরুতর মামলায় নাম আসা এবং ব্যাপক সমালোচনার মুখে ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সুপারিশে সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে মাহাবুব হোসেন সামিরকে মাত্র ২১ দিনের মাথায় অব্যাহতি দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাহাবুব হোসেন সামিরের বিরুদ্ধে এর আগেও হত্যা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইসহ একাধিক অভিযোগ ছিল। আলোচিত রুবেল হত্যা মামলায় নাম থাকার পরও কীভাবে তিনি ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ পদ পান, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় তার বিতর্কিত ভূমিকা নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি ও তার ভাই যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচিত হৃদয় হোসেন ওরফে ফর্মা হৃদয় আন্দোলন দমনে সক্রিয় ছিলেন। পরে ৫ আগস্টের পর নিজেকে জুলাই আন্দোলনের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করেন বলেও স্থানীয়দের দাবি।
এছাড়া মাহাবুব হোসেন সামিরের ভাই হৃদয় হোসেন ওরফে ফর্মা হৃদয় দেড় কোটি টাকা মূল্যের হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনাও এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এ বিষয়ে সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ও চলতি দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, "বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা মাহাবুব হোসেন সামির ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া দুটি মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের আইনের আওতায় এনে আদালতে সোপর্দ করা হবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না।"
দুই মামলার প্রধান আসামি মাহাবুব হোসেন সামিরসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবার দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
আরও পড়ুন:








