রবিবার

২৮ জুন, ২০২৬ ১৪ আষাঢ়, ১৪৩৩

শাসন বদলালেও থামছে না হেফাজতে মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬ ০৮:০৪

আপডেট: ২৮ জুন, ২০২৬ ০৮:১০

শেয়ার

শাসন বদলালেও থামছে না হেফাজতে মৃত্যু
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল এবং আইনের পরিবর্তন সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বিগত দুই দশকে বিভিন্ন সরকারের আমলে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে মৃত্যুর যে ধারা তৈরি হয়েছিল, তা বর্তমান সময়েও অব্যাহত রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে গতানুগতিকভাবে দায় অস্বীকার করার সংস্কৃতিও অপরিবর্তিত রয়েছে।

সম্প্রতি ফরিদপুরে ডিবি হেফাজতে স্থানীয় আইন কলেজের শিক্ষার্থী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ প্রান্ত এবং চট্টগ্রামে কারা হেফাজতে যুবলীগ নেতা নুরুল আলমের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নাগরিকের নিরাপত্তা ও জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ফরিদপুরে প্রান্তকে আটকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, গত ২১ জুন বিকেলে মধুখালী উপজেলার পৌরসদরের গোন্দারদিয়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রান্তকে ল্যাপটপের ব্যাগসহ কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে ধরেন। প্রান্তর পরিবারের অভিযোগ, তাকে হেফাজতে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তদন্ত ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় বলে বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

একইভাবে চট্টগ্রামে কারা হেফাজতে নুরুল আলমের মৃত্যুর পর তার পরিবারও নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় নুরুল আলম সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ দাবি করেছে, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত দেশে হেফাজতে নির্যাতনের কারণে অন্তত ৪৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ৪ হাজার ২৮৯ জন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে ১৮৪টি, ২০০৬ থেকে ২০০৭ সালের স্বল্পমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ৬টি এবং ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে ৪২টি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, যার সংখ্যা ২১৩। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ২৯টি এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের মেয়াদে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ জুন ২০২৬ পর্যন্ত আরও ২টি মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মে মাসের প্রতিবেদনেও বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং হেফাজতে মৃত্যুর চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, মে মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে চারজন দণ্ডিত ও তিনজন বিচারাধীন বন্দিসহ মোট সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া মাদকবিরোধী অভিযান ও বন বিভাগের গুলিতেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, হেফাজতে নির্যাতন কেবল শারীরিক আঘাত নয়, বরং দীর্ঘ সময় দাঁড় করিয়ে রাখা, ঘুমাতে না দেওয়া, খাবার ও পানি থেকে বঞ্চিত করা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাখার মতো মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নও এর অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়ে যারা বেঁচে ফেরেন, তাদের শরীরে ও মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত থেকে যায়। যেমন ২০১৪ সালে পুলিশি নির্যাতনে ভাই জনির মৃত্যুর বিচার চেয়ে এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন ইমতিয়াজ হোসেন রকি। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর অধীনে মামলা করে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন।

দেশের সংবিধানে নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনে এবং ২০২৫ সালে এর পরিপূরক প্রটোকল ওপি-সিএটিতে স্বাক্ষর করেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, আইনের প্রয়োগ দুর্বল হওয়া এবং নিরপেক্ষ তদন্তের অভাবেই হেফাজতে মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তিনি মনে করেন, স্বাধীন তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন।

অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের মধ্যে কর্তৃত্ববাদী চর্চা রয়ে গেছে। তিনি জানান, পুনর্বিবেচনার নামে মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিল সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে যদি নতুন করে সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়, তবে তা আত্মঘাতী হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অধিকার-এর পরিচালক মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তির সুরক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাই হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে শুধু একটি মামলা বা ময়নাতদন্ত যথেষ্ট নয়। আটক থেকে শুরু করে জিজ্ঞাসাবাদ এবং চিকিৎসার প্রতিটি ধাপ নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। গুম ও নির্যাতন তদন্তে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বাইরে পৃথক বিশেষায়িত কাঠামো গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শেখ শাহরিয়ার বিন মতিনের মা মমতাজ বেগমের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, একটি মৃত্যু পুরো পরিবারকে সামাজিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। মানবাধিকার কর্মী ইজাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিটি ঘটনায় সত্য উদ্ঘাটন, স্বাধীন তদন্ত এবং পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।



banner close
banner close