শুক্রবার

২৬ জুন, ২০২৬ ১২ আষাঢ়, ১৪৩৩

২০ বছর কারাবন্দী হাফেজ নাঈমের মৃত্যুদণ্ড: নির্যাতনে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬ জুন, ২০২৬ ১৮:১৪

আপডেট: ২৬ জুন, ২০২৬ ১৮:১৯

শেয়ার

২০ বছর কারাবন্দী হাফেজ নাঈমের মৃত্যুদণ্ড: নির্যাতনে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দা হাফেজ সৈয়দ নাঈম আহমদ আরিফ ২০০৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে কারাবন্দী রয়েছেন। দীর্ঘ প্রায় বিশ বছর কারাগারে থাকার পর সম্প্রতি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের উপর গ্রেনেড হামলার হত্যা মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। তাঁর আইনি প্রতিনিধি ও সমর্থকদের অভিযোগ, একমাত্র স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা রিমান্ডে নির্যাতনের মাধ্যমে জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছিল।

মামলার বর্তমান অবস্থা

নাঈম আহমদের বিরুদ্ধে বর্তমানে চারটি মামলা বিদ্যমান। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের হত্যা মামলায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিস্ফোরক মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার হত্যা মামলার বিচার বর্তমানে চলমান রয়েছে। চতুর্থ মামলার কার্যক্রমও অব্যাহত আছে। এর আগে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মোট ১৪টি মামলার মধ্যে ১০টি থেকে তিনি ইতোমধ্যে অব্যাহতি পেয়েছেন।

গ্রেফতার ও রিমান্ডের বিবরণ

নাঈম আহমদের বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ভোরে সাদা পোশাকের একদল ব্যক্তি তাঁকে সৈয়দপুর বাজারে অবস্থিত তাঁর লাইব্রেরি থেকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে জানা যায়, র‍্যাব সদস্যরা তাঁকে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁকে প্রথমে সিলেট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে উপস্থিত করা হয় এবং দশ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

এরপর তাঁকে ঢাকায় র‍্যাব-১-এর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল বা জেআইসিতে নেওয়া হয়, যা পরবর্তীকালে আয়নাঘর নামে পরিচিতি পায়। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে একটানা ৭৭ দিন রিমান্ডে রাখা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

নির্যাতন ও স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ

নাঈম আহমদের লিখিত বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, সিআইডির তৎকালীন এএসপি মুন্সী আতিকুর রহমান তাঁর উপর নির্যাতনের নির্দেশনা দেন এবং নিজেও সরাসরি অংশ নেন। তাঁর পরিবারকে গ্রেফতার ও ক্রস ফায়ারের হুমকি দিয়ে একটি পূর্বপ্রস্তুত লিখিত বিবরণ মুখস্থ করতে বাধ্য করা হয়। পরে ম্যাজিস্ট্রেট হাজেরা খাতুনের সামনে সেই জবানবন্দি দিতে বাধ্য করা হয় বলে তিনি দাবি করেছেন।

নাঈম আহমদ আরও দাবি করেছেন, তিনি পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের আবেদন করেন, যা মামলার নথিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আইনি যুক্তি ও পর্যবেক্ষণ

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে বলেন, কাউকে শাস্তি দিতে হলে শক্ত প্রমাণ প্রয়োজন, কিন্তু এই মামলায় আসামির স্বীকারোক্তি ছাড়া অন্য কোনো প্রমাণ নেই। একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীও নেই। তবু কেবল স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিস্ফোরক মামলায় আদালত তাঁকে খালাস দেওয়ার বিষয়টিকে তাঁর সমর্থকরা নির্দোষিতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করছেন।

রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রেক্ষাপট

নাঈম আহমদ ১৯৮১ সালের ৭ জুলাই জগন্নাথপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ছাত্র জমিয়তের জগন্নাথপুর থানা শাখার সহ-প্রচার সম্পাদক এবং সৈয়দপুর শাহাড়পাড়া ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি চারদলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা শাহিনুর পাশা চৌধুরীর পক্ষে প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

২০০৫ সালের উপনির্বাচনেও তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। তিনি দাবি করেন, প্রতিবেশী ও তৎকালীন জাতীয় পার্টির প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আলি আহমদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের জেরে তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এর পক্ষে তাঁর কাছে প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই।

পারিবারিক পরিস্থিতি

নাঈম আহমদ কারাবন্দী থাকাকালীন ২০১৩ সালে তাঁর পিতা মাওলানা সৈয়দ আবুল কালাম মৃত্যুবরণ করেন। তিনি পিতার দাফন-কাফনে অংশ নিতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। কারাগারে দীর্ঘ অবস্থানকালে তাঁর পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।



banner close
banner close