রাজধানীর ৫০টি থানা এলাকায় বর্তমানে অন্তত ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য থেকে জানা গেছে। পাড়া-মহল্লার আধিপত্য বিস্তার ছাড়িয়ে এসব গ্যাং এখন মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধ বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব গ্যাং মূলত স্থানীয় প্রভাবশালী ও মাদক কারবারিদের মাঠপর্যায়ের বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে মিরপুর বিভাগে। এই বিভাগের ৭টি থানায় ৩২টি গ্যাং সক্রিয়, যার মধ্যে কেবল পল্লবী এলাকাতেই রয়েছে ১৪টি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তেজগাঁও বিভাগের ৬টি থানায় ২৬টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে মোহাম্মদপুর এলাকায় রয়েছে ১৬টি গ্যাং। এছাড়া ওয়ারী বিভাগে ১৩টি, গুলশানে ১১টি, লালবাগে ১০টি, মতিঝিলে ১০টি, উত্তরায় ১০টি এবং রমনা বিভাগে ৬টি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা চরম আকার ধারণ করেছে। গত ১১ জুন শেরেবাংলা নগর এলাকায় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে দুই পুলিশ সদস্য ছুরিকাঘাতের শিকার হন। একই দিনে আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় একটি বিকাশ এজেন্টের দোকানে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে তিন লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এছাড়া মিরপুর, পল্লবী ও কাফরুল এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল আরোহীকে আঘাত করে গাড়ি ছিনতাই এবং অস্ত্রের মহড়া দেওয়ার মতো একাধিক অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেরই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, কিশোর গ্যাংগুলো মূলত পাঁচটি কারণে বিকশিত হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হলো মাদকের খুচরা নেটওয়ার্ক পরিচালনা। কিশোরদের দিয়ে ইয়াবা, গাঁজা ও আইসের মতো মাদক সরবরাহ ও পাহারার কাজ করানো হয়। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় বাজার, স্ট্যান্ড ও ফুটপাতে আধিপত্য ধরে রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিশোর গ্যাং তৈরির অন্যতম বড় কারণ। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে কিশোরদের আনুগত্য ও অভিভাবকত্ব বদলে যায়, যা এলাকায় নতুন নতুন সংঘাতের জন্ম দেয়। পাশাপাশি পুরোনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের হয়ে ভাড়াটে হিসেবে কাজ করা এবং বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতার সুযোগে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসাও এদের বেপরোয়া করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম জানান, এলাকায় মাসল পাওয়ার বা পেশিশক্তি প্রদর্শনের সংস্কৃতি থেকে রাজনৈতিক ও অপরাধী চক্রের মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে। আধিপত্য বজায় রাখতে যে জনবল প্রয়োজন, তা কিশোরদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। ফলে কিশোররা মাদক বহন থেকে শুরু করে চাঁদাবাজি ও প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক জানান, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত কিশোরদের একটি স্বার্থান্বেষী মহল অপরাধে ব্যবহার করছে। শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয় বরং এর নেপথ্যে থাকা পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এগুলোর মধ্যে এলেক্স গ্রুপ, ইমন গ্রুপ, শুটার আনোয়ার গ্রুপ, কব্জি কাটা গ্রুপ এবং আকাশ গ্রুপ অন্যতম। পুলিশ ও র্যাবের নিয়মিত অভিযানের পরও এসব গ্রুপ ভিন্ন ভিন্ন নামে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ চলছে। তবে এটি মোকাবিলায় পরিবারের নজরদারি ও সামাজিক প্রতিরোধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন জানান, কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। তবে এই সামাজিক সংকট নিরসনে এককভাবে পুলিশের চেষ্টার পাশাপাশি সম্মিলিত সামাজিক প্রচেষ্টার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আরও পড়ুন:








