কক্সবাজার জেলায় এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, যাদের প্রায় ৯৩ শতাংশই রোহিঙ্গা শরণার্থী। সংশ্লিষ্টদের মতে, অবাধ যৌন সম্পর্ক, বহুবিবাহ, স্বাস্থ্যশিক্ষার অভাব, সচেতনতার ঘাটতি এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে অনীহার কারণে এই সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের মোট এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে কক্সবাজারে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার জন, যাদের মধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মাত্র ১৭০ জন। বাকি অধিকাংশই উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপের পাশাপাশি কক্সবাজার এখন আরও একটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টারের তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের বড় ধরনের আগমনের পর থেকে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করে। কেন্দ্রটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে নতুন করে ২১৭ জন এইচআইভি পজিটিভ রোগী শনাক্ত হন, যাদের সবাই রোহিঙ্গা। আগের বছর ২০২৪ সালে শনাক্ত হয়েছিল ২১৫ জন।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্তের হার অনেক বেশি। তিনি জানান, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিতভাবে কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যা শুধু আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আক্রান্ত মায়েদের মাধ্যমে নবজাতকদের শরীরেও ভাইরাসটি সংক্রমিত হচ্ছে, যার ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এইচআইভি ও এইডস বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যশিক্ষার ঘাটতি রয়েছে এবং অনেকেই জানেন না এই ভাইরাস কীভাবে ছড়ায় বা প্রতিরোধ করা যায়। তিনি বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি অসচেতন থাকলে তার মাধ্যমে আরও অনেকের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত মায়েদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সতর্কতা নিশ্চিত না করা হলে গর্ভাবস্থায় কিংবা জন্মের সময় শিশুর শরীরেও এইচআইভি সংক্রমিত হতে পারে।
কক্সবাজার এআরটি সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. মেজবাহ জানান, বর্তমানে কয়েকজন শিশু এইচআইভি পজিটিভ অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে, যারা জন্মগতভাবে মায়ের কাছ থেকে ভাইরাসটি লাভ করেছে। তিনি বলেন, এ ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রিভেনশন অব মাদার টু চাইল্ড ট্রান্সমিশন কর্মসূচির আওতায় আক্রান্ত মায়েদের বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা সেবা যথেষ্ট নয়, বরং ব্যাপক স্বাস্থ্যশিক্ষা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, নিয়মিত পরীক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কমানোর লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তা না হলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জে রূপ নিতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
আরও পড়ুন:








