২০২১ সালের মার্চ মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ৫ বছর পূর্ণ হলেও বিচার প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে নিহত ১৫ জনের পরিবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অপেক্ষায় দিন অতিবাহিত করছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকার বায়তুল মোকাররমে মোদিবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলার সংবাদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছালে স্থানীয় জনতা ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ২৬শে মার্চ থেকে ৩০শে মার্চ পর্যন্ত দফায় দফায় চলা এই সহিংসতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৬শে মার্চ প্রথম প্রাণ হারান ১৭ বছর বয়সী ইঞ্জিন মিস্ত্রি আশিক মিয়া। ২৭শে মার্চ সহিংসতার ভয়াবহতা বৃদ্ধি পায় এবং এদিন শহরের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে মাওলানা হুসাইন আহমাদ, হাফেজ জুবায়ের, হাফেজ কাউসার উদ্দিন, শ্রমিক কাউসার মিয়া, বাদল মিয়া, জহিরুল আলম ওরফে জুরু আলম, মুশাহিদ, ফয়সাল মিয়া ও কামাল উদ্দিন নিহত হন। এর মধ্যে নন্দনপুর এলাকায় একযোগে চারজনের মৃত্যু হয়। ২৮শে মার্চ নিহত হন আশিকুল ইসলাম, আল আমিন, হাদিস মিয়া ও লিটন মিয়া। এছাড়া পুলিশি নির্যাতনে গুরুতর আহত ছাত্র আসাদুল্লাহ রাতিন ৩০শে মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য উবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী এবং পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানের সরাসরি নির্দেশে পুলিশ ও বিজিবির পাশাপাশি ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের ওপর আক্রমণ চালায়। নিহত কামালের পরিবার অভিযোগ করেছে যে, তার মরদেহ ফেরত পেতে তৎকালীন সময়ে ৮০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছিল। অন্যদিকে, রাতিনের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘাতের ঘটনায় আহত পরিচয় পেয়ে চিকিৎসকেরা তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করেননি।
হেফাজতে ইসলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মুফতি আলী আজম কাসেমী এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য উবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীকে দায়ী করেছেন। তিনি এই নৃশংস ঘটনার সাথে জড়িত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সকল দোষীর দ্রুত বিচারের দাবি জানান। সংগঠনের জেলা সভাপতি মুফতী মুবারকুল্লাহ জানান, বিগত সরকারের আমলে কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি, বরং মিথ্যা মামলা দিয়ে স্থানীয়দের হয়রানি করা হয়েছে।
মামলার বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা জানান যে, আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তবে দীর্ঘ ৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ায় এবং নিহতদের পরিবারগুলো চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ১৫টি অকাল মৃত্যুর এই ট্র্যাজেডি আজও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনপদে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
আরও পড়ুন:








