রবিবার

২১ জুন, ২০২৬ ৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

আব্বা আমাকে ক্ষমা করে দাও রাশিয়া থেকে যুবকের শেষ বার্তা

হাফিজুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:

প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০২৬ ২০:৪২

শেয়ার

আব্বা আমাকে ক্ষমা করে দাও রাশিয়া থেকে যুবকের শেষ বার্তা
ছবি সংগৃহীত

পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে একসময় মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতেন বাংলাদেশের যুবকেরা। সময়ের সঙ্গে সেই গন্তব্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে রাশিয়াও। কিন্তু স্বপ্নের সেই বিদেশযাত্রা অনেকের জন্যই পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে শত শত বাংলাদেশি নিখোঁজ হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে জোরপূর্বকভাবে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অনেককে। জীবিকা অর্জনের আশায় বিদেশে যাওয়া এসব যুবকের অনেকেই আর ফিরতে পারছেন না স্বজনদের কাছে।

এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার হয়েছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার দাইপুকুরিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লস্করপুর বাটার মোড় এলাকার যুবক ওয়াসিম আকরাম। পরিবারের অভিযোগ, রাজমিস্ত্রির কাজ দেওয়ার কথা বলে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হলেও সেখানে পৌঁছানোর পর রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে তারা জানতে পারেন, ওয়াসিম যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয়েছেন।

ওয়াসিমের বাবা আনারুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আব্বা আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমার জন্য দোয়া করিও।” এটাই ছিল ছেলের শেষ কথা। তিনি জানান, শুরু থেকেই ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু দালালদের আশ্বাসে জমিজমা বিক্রি করেন, এনজিও থেকে ঋণ নেন এবং ছেলেকে বিদেশে পাঠান। শেষবার মোবাইলে কথা বলার পর থেকে এখন পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন ছেলের খোঁজের জন্য।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার ধাইনগর এলাকার রাসেল খান নামের এক দালালের মাধ্যমে ওয়াসিমকে রাশিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। মাসে লক্ষাধিক টাকা বেতনের আশ্বাস দিয়ে পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৮ লাখ টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে রাজমিস্ত্রির কাজ না দিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।

ওয়াসিমের মা ইসমোতারা বেগম বলেন, তিনি বারবার ছেলেকে বিদেশ যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু ছেলে তাকে আশ্বস্ত করে বলেছিল, বিদেশে গেলেও সবসময় ফোনে যোগাযোগ রাখবে। এখন সেই সন্তানের কোনো খোঁজ না পেয়ে দিনরাত কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি।

ওয়াসিমের বড় ভাই জসিম উদ্দিন প্রতারক দালালদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বলেন, “এসব দালালদের উপযুক্ত শাস্তি চাই। আর আমার ছোট ভাই যদি জীবিত থাকে, তবে তাকে ফেরত চাই।

ছোট বোন আম্বিয়া খাতুন অভিযোগ করে বলেন, বিদেশে যেতে না চাইলে স্থানীয় সহযোগী বাবু তাদের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমার ভাই বিদেশে না যেতে চাইলে বাবু হুমকি দিয়ে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। বলে তোমার বাপ-মাকে জেলে ভরবো।”

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় সহযোগী এম. বাবু। তিনি দাবি করেন, কাউকে হুমকি দেননি। বরং ওয়াসিমকে নিজের সন্তানের মতো ভেবেই সহযোগিতা করেছিলেন।

ঘটনার বিষয়ে প্রথম সন্দেহের সূত্র পান ওয়াসিমের দুলাভাই মোক্তার হোসেন। তিনি জানান, গত ২৯ মে ভিডিও কলে রুশ সেনাবাহিনীর পোশাকে অস্ত্র হাতে ওয়াসিমকে দেখতে পান। তখন ওয়াসিম অভিযোগ করে বলেন, দালালচক্র প্রতারণা করে তাদের রুশ বাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাসেল নামের ওই দালালের নিজস্ব কোনো লাইসেন্স না থাকায় লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে ওয়াসিমকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়।

অভিযোগের বিষয়ে রাসেল বলেন, আমাদের নিজস্ব লাইসেন্স নেই। তাই অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে লোক পাঠানো হয়।”

এদিকে সোনারগাঁ ট্রেনিং সেন্টার (এসটিসি)-এর পরিচালক ইব্রাহিম জানান, জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে ওয়াসিম রাশিয়ায় গেছেন। সরকার প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল করেছে এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করেছে। তবে ঘটনার বিষয়ে এখন তারা সরকারি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন।

রিক্রুটিং এজেন্সি জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনালের মালিক মিজানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে ওয়াসিমকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।

দাইপুকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলোমগীর (রেজা) বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি মানবপাচার ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, পরিবার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সরকারি সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.এন.এম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, দালালচক্রের প্রতারণার মাধ্যমে ক্ষতির শিকার হওয়ায় পরিবারকে আইনি সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা আর ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।



banner close
banner close