রবিবার

২১ জুন, ২০২৬ ৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

৯ বছরেও খোলেনি রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ জুন, ২০২৬ ১১:০৫

শেয়ার

৯ বছরেও খোলেনি রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ
ছবি সংগৃহীত

নিরাপদে নিজ ভূমিতে ফেরার আশায় দিন গুনছেন বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। একদিকে মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসার কারণে রোহিঙ্গা সংকট নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় আজ শনিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব শরণার্থী দিবস।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত, নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রতি সংহতি জানাতে দিবসটি পালিত হয়। তবে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে দিনটি প্রতি বছর ফিরে আসে অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে।

বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে মাত্র কয়েক সপ্তাহে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। পরবর্তী সময়ে নতুন করে আরও দেড় লাখের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট এখন অর্থায়ন সংকটেও রূপ নিয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের ন্যূনতম মানবিক সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলে তিনি জানান। একই সঙ্গে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় ৯ বছর পূর্ণ হতে চলেছে, কিন্তু রাখাইন অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধাবস্থা এখনো প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি।

আরআরআরসি কার্যালয় জানায়, ২০১৮ সালে প্রায় আট লাখ রোহিঙ্গা পরিবারের তথ্য মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ পরিবারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময়ে পরিবারগুলোর সদস্যসংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ায় নতুন করে তথ্য হালনাগাদ ও যাচাইয়ের কাজ চলছে।

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দারাও। রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার অবস্থানের কারণে পরিবেশ, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। স্থানীয় মানুষ এখন প্রত্যাবাসনের কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চান না রোহিঙ্গারা

রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মাস্টার জুবায়ের হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের প্রতি রোহিঙ্গারা কৃতজ্ঞ, কিন্তু তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হলে তারা স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে প্রস্তুত বলে তিনি জানান। ক্যাম্পে থাকা সাধারণ রোহিঙ্গারাও একই দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না।

উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, প্রায় ৯ বছর ধরে তারা শরণার্থী হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন এবং তাদের সন্তানদের অনেকেই মিয়ানমার দেখেনি। বাংলাদেশে নিরাপদে থাকলেও এটি তাদের দেশ নয় এবং তারা নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে চান বলে তিনি জানান। তবে ফিরে গিয়ে আবার নির্যাতন, সহিংসতা বা বৈষম্যের শিকার হতে হলে সেই প্রত্যাবাসনের কোনো অর্থ থাকবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

বালুখালী ক্যাম্পের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, মিয়ানমার ছেড়ে আসার সময় তিনি সবকিছু হারিয়েছেন। বাড়িঘর, জায়গা-জমি, আত্মীয়স্বজন কিছুই আর আগের মতো নেই বলে তিনি জানান। একজন মা হিসেবে সন্তানদের একটি স্বাভাবিক ভবিষ্যৎ দেখতে চান বলে তিনি উল্লেখ করেন। তারা ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল জীবন চান না, বরং নিজের দেশে সম্মান নিয়ে বাঁচার সুযোগ চান বলে তিনি জানান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তাদের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া বলে তিনি মন্তব্য করেন।

টেকনাফের নয়াপাড়া ক্যাম্পের যুবক আবদুন নবী বলেন, শরণার্থী শিবিরের জীবন সীমাবদ্ধতার জীবন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা সব সময় তাড়া করে এবং তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হতাশায় ভুগছে বলে তিনি জানান। বাংলাদেশ সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে ক্যাম্পে বসবাস কোনো সমাধান নয়। তিনি এমন একটি প্রত্যাবাসন চান, যেখানে তাদের পরিচয়, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে।

উখিয়ার জামতলী ক্যাম্পের জমিলা খাতুন বলেন, নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টের মধ্যে আছেন। অনেকেই স্বজন হারিয়েছেন, অনেকের পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারপরও আশা ছাড়েননি বলে তিনি জানান। তারা তাদের গ্রাম, স্মৃতি ও শিকড়ে ফিরে যেতে চান, কিন্তু সেই প্রত্যাবাসন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। শুধু সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শালবাগান ক্যাম্পের ফরিদ আহমেদ বলেন, তিনি জীবনের শেষ সময়ে নিজের জন্মভূমি আরেকবার দেখতে চান। তারা কখনো বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থাকার দাবি করেননি বলে তিনি জানান। মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি এবং নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তাই তাদের একমাত্র দাবি বলে তিনি উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আন্তরিকভাবে এগিয়ে এলে এই সংকটের সমাধান সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

চাপ বাড়ছে স্থানীয় জনপদে

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে আশ্রয়দাতা এলাকার জনজীবনে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতিতে বনভূমি উজাড়, পরিবেশের ভারসাম্যহানি, শ্রমবাজারে মজুরি কমে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের বিষয়টি সমর্থন করেন, তবে সংকটের দ্রুত ও টেকসই সমাধান দেখতে চান।

উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্প স্থাপনের শুরুতে হাজার হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি কেটে ফেলা হয়েছিল এবং এখনো বনাঞ্চলের ওপর চাপ রয়েছে। আগে যেসব এলাকায় বন্যপ্রাণী দেখা যেত, সেসব জায়গার পরিবেশ অনেকটাই বদলে গেছে বলে তিনি জানান। বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সমাজকর্মী জুবাইদা বেগম বলেন, আগে গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ দিনমজুরের কাজ করে ভালো মজুরি পেতেন, কিন্তু এখন শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে মজুরি কমে গেছে। এতে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি জানান।

কোটবাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সেলিম বলেন, জনসংখ্যার চাপ বেড়ে যাওয়ায় সড়ক, বাজার, পানি ও অন্য সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে এবং স্থানীয়রাও নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীকেও আরও বেশি সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জেসমিন আক্তার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় উন্নত হলেও স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনো উদ্বেগ রয়েছে। মাদক, মানব পাচার ও অপরাধ চক্রের তৎপরতা নিয়ে আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি বলে তিনি জানান। নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেন তিনি।

নারী ও কিশোরীদের ঝুঁকি

রোহিঙ্গা শিবিরে নারী ও কিশোরীরা এখনো নানা ঝুঁকির মধ্যে জীবনযাপন করছেন। মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও সীমিত সুযোগের কারণে বাল্যবিবাহ, মানব পাচার, নিরাপত্তাহীনতা এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার মতো সমস্যা উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। বিশেষ করে কিশোরীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে।

উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা রাশেদা খাতুন বলেন, অনেক পরিবার দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার কারণে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করছে।

শফিউল্লাহ কাটা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিশোরী নুর আয়েশা বলেন, তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চান, কিন্তু অনেক মেয়েই বিভিন্ন কারণে স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে। সুযোগ পেলে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান বলে তিনি জানান।

কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক পরিবার উদ্বিগ্ন থাকে এবং সন্ধ্যার পর চলাফেরা ও বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে সতর্ক থাকতে হয়। নারী ও শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

নয়াপাড়া ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, দালাল চক্র এখনো সক্রিয় এবং উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে অনেক নারী ও তরুণকে পাচারের চেষ্টা করা হয়। সচেতনতা বাড়লেও ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং এ বিষয়ে আরও কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান।

মোচনী ক্যাম্পের হাজেরা খাতুন বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হয়। বছরের পর বছর ক্যাম্পে থেকে অনেক শিশুর পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো না গেলে একটি পুরো প্রজন্ম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চলে যাবে বলে তিনি সতর্ক করেন।

এদিকে বিশ্ব শরণার্থী দিবস উপলক্ষে কিছুটা স্বস্তির খবরও এসেছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সহায়তায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অতিরিক্ত ১৪ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দিয়েছে। এই অর্থ মানবিক সহায়তা, শিক্ষা, সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।

প্রায় এক দশক ধরে বাস্তুচ্যুত লাখো মানুষের জীবন থমকে আছে অপেক্ষায়। বাংলাদেশ মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তাদের আশ্রয় দিয়ে এলেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগের দাবি ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে।



banner close
banner close