বৃহস্পতিবার

১৮ জুন, ২০২৬ ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩

অনলাইন জুয়ার ডিজিটাল থাবায় বিপন্ন তরুণ সমাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ জুন, ২০২৬ ০৮:২৬

শেয়ার

অনলাইন জুয়ার ডিজিটাল থাবায় বিপন্ন তরুণ সমাজ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

বাংলাদেশে মাদকের চেয়েও ভয়াবহ এক নীরব মহামারি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে অনলাইন জুয়া। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চক্র দেশের তরুণ ও যুবসমাজকে এই নেশায় আসক্ত করছে। রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার প্রলোভনে পড়ে হাজারো মানুষ সর্বস্বান্ত হচ্ছে, যার ফলে সমাজে পারিবারিক কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ, চুরি-ছিনতাই এবং আত্মহত্যার মতো অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার-দক্ষিণের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ জানান, অনলাইন জুয়ার বিস্তার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং ডিবি নিরবচ্ছিন্নভাবে সাইবার প্যাট্রোলিং চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তবে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি ডিবির তফসিলভুক্ত না হওয়ায় তারা এর তদন্ত করতে পারছেন না। আইন অনুযায়ী মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত বিষয়গুলো কেবল সিআইডি তদন্ত করতে পারে। তবে জুয়ার ব্যাপক বিস্তারের কারণে কেবল সিআইডির পক্ষে সব তদন্ত পরিচালনা করা দুরূহ হয়ে পড়ছে।

গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মেল বেট, মোস্ট বেট, ওয়ানএক্স বেট, টুয়েন্টি টু বেট, বেট উইনার ও জেটবাজের মতো ওয়েবসাইট এবং অ্যাপগুলো দেদার পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব সাইটে তরুণদের আকৃষ্ট করা হয়। চীন ও নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ঢাকা, দুবাই, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ভারত ও পাকিস্তান থেকে এই জুয়া সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকরা মূলত এই কার্যক্রমের নেপথ্যে কাজ করছে। তাদের সহায়তায় দেশে একাধিক এজেন্ট চক্র সক্রিয় রয়েছে যারা ১৪ থেকে ২০ শতাংশ কমিশন পায়। এমনকি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের কিছু অসাধু কর্মীর বিরুদ্ধেও এই চক্রকে সহায়তার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে জুয়া সিন্ডিকেটের বেশ কয়েকজন সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। গত ১৩ মে ডিবির সাইবার ইউনিট ছয় চীনা নাগরিকসহ নয়জনকে গ্রেফতার করে। এছাড়া ৬ মে সিআইডি একটি চক্রের আট সদস্যকে গ্রেফতার করে যারা প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিত। সিআইডির ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি আলি আকবর খান জানান, অনলাইন জুয়া বন্ধে নিয়মিত সাইবার মনিটরিং করা হচ্ছে। ১ মে থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত ২৬৮টি জুয়ার সাইট বন্ধের জন্য বিটিআরসিকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জুয়ার লেনদেনে ব্যবহৃত ৮৭৯টি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট এবং ৪৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বিএফআইইউকে অনুরোধ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, জুয়ার মূল হোতারা দেশের বাইরে থাকায় এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ থাকায় এই থাবা পুরোপুরি নির্মূল করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনলাইন জুয়ার প্রভাবে সমাজে অপরাধের হার বাড়ছে। গত ১ মে কুমিল্লার বরুড়ায় জুয়া সংক্রান্ত বিরোধের জেরে রাকিব হোসেন নামের এক কিশোর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এছাড়া ২৬ মে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে জুয়ায় আসক্ত এক যুবক তার স্ত্রীকে হত্যা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান এই আসক্তিকে মাদকের চেয়েও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, জুয়া মস্তিষ্কের ফিজিক্যাল প্লেজার সেন্টার দখল করে নেয়। খেলোয়াড়রা হারানো অর্থ পুনরুদ্ধারের নেশায় বা রিকভারি মোটিভেশনের কারণে বারবার খেলে এক পর্যায়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে।

দুর্বল আইন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন বিদেশি চক্রের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই ডিজিটাল অপরাধ দমনে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। তবে সাইবার নজরদারি ও আর্থিক লেনদেনের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণারোপের মাধ্যমে এই মহামারি মোকাবিলার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।



banner close
banner close