বৃহস্পতিবার

১৮ জুন, ২০২৬ ৫ আষাঢ়, ১৪৩৩

তিন বছরের ফিটনেসবিহীন গাড়ি পেল সরকারি কলেজ শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৬ ২২:৩৫

শেয়ার

তিন বছরের ফিটনেসবিহীন গাড়ি পেল সরকারি কলেজ শিক্ষার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত

মোঃ মোজাম্মেল হোসেন ধামরাই

দেশব্যাপী ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ কাগজপত্রের যানবাহনের বিরুদ্ধে সরকার যখন কঠোর অবস্থান নিয়েছেন, ঠিক তখনই ঢাকার ধামরাই সরকারি কলেজে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য চালু করা হয়েছে দুটি ফিটনেসবিহীন বাস। যেগুলোর ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ প্রায় তিন বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। বিষয়টি সামনে আসার পর কলেজ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।

ধামরাই উপজেলার একমাত্র সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধামরাই সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ৫৪ বছর পর শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করতে বিআরটিসি থেকে‘বংশাই’ও ‘তারুণ্য’নামে দুটি বাস চলাচলের উদ্যোগ নিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। বুধবার দুপুরে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ তমিজ উদ্দিন উপস্থিত থেকে বাস দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শুরুতে আনন্দ প্রকাশ করলেও পরে বাস দুটি ফিটনেসবিহীন থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয় শিক্ষার্থীদের মাঝে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর অনলাইন তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রো- ব-১৫-৬২৩৬ নম্বর বাসটির ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল। অপরদিকে ঢাকা মেট্রো-ব-১৫-৬২৭৭ নম্বর বাসটির ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি। অর্থাৎ বাস দুটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া রয়েছে।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থী পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৩৪টি শর্ত সম্বলিত একটি পরিবহন কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি যাচাই-বাছাই করে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত পরিবহন নির্বাচন করার কথা থাকলেও তার কোন শর্তই মানা হয়নি। কমিটি যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই বাস দুটি অনুমোদন দিয়েছে। বিশেষ করে ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেন ও অন্যান্য আইনি নথি যাচাই না করেই উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়েছে, যা দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে।

সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী বৈধ ফিটনেস সনদ ছাড়া কোনো মোটরযান সড়কে চলাচল করতে পারে না। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। সেখানে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্রের যানবাহন উদ্বোধন এবং শিক্ষার্থী পরিবহনের জন্য প্রস্তুত করা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে মাসুদ সরদার বলেন, যেখানে প্রতিনিয়ত ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, সেখানে একটি সরকারি কলেজ কীভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রবিহীন ও ৩ বছর পূর্বের ফিটনেসবিহীন বাস শিক্ষার্থীদের জন্য উদ্বোধন করলো? সংশ্লিষ্ট কমিটি ও কলেজ প্রশাসন কি বাসগুলোর আইনগত বৈধতা যাচাই করেছিল? নাকি শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে?

বাস দুটির চালক সঞ্জয় চৌধুরী ও রমজান আলী সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, বাস দুটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় ছিল। পরে সেগুলো সংস্কার করে চালানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ না থাকার বিষয়টি তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন বলে জানান তারা।

একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বাস দুটি দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় ছিল। সম্প্রতি বাহ্যিকভাবে সংস্কার ও রং করে সেগুলো চলাচলের উপযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু যানবাহনগুলোর প্রয়োজনীয় ফিটনেস সনদ ও ট্যাক্স টোকেন নবায়ন না করেই আমাদের পরিবহনের জন্য উদ্বোধন করা হয়েছে।

ধামরাই সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ফাহাদ জানান, কোনো ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাসে তারা যাতায়াত করতে চান না। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাসগুলোর ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেনসহ সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র হালনাগাদ করে নিরাপদ ও মানসম্মত পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানাই।

শিক্ষার্থী আফছানা আক্তার জানান, প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীর জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট এমন একটি বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল। কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করলেই কোনো যানবাহন নিরাপদ হয়ে যায় না। বৈধ কাগজপত্র, কারিগরি সক্ষমতা ও সড়কে চলাচলের অনুমোদন নিশ্চিত করেই শিক্ষার্থী পরিবহন চালু করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে পরিবহন কমিটির আহ্বায়ক ও ধামরাই সরকারি কলেজের শিক্ষক প্রফেসর মো: শফিউল্লাহ বলেন, বাস দুটির ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদোত্তীর্ণ থাকার বিষয়টি তার জানা ছিল না। যদি এমন হয়ে থাকে তাহলে আমরা অবশ্যই এটা মেনে নিবো না। আমরা বিআরটিএ এর কতৃপক্ষের সাথে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করবো।

এ বিষয়ে ধামরাই সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ ইফতেখার আলী বলেন, অন্যান্য কলেজের মতই শিক্ষার্থীদের জন্য পরিবহন ব্যবস্থার জন্য ৩৪ টি শর্ত দিয়ে গাড়ি দুটি আনা হয়েছে। আর বিআরটিসি তো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান সেখান থেকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি দিবে এটা তো আমরা কল্পনাই করতে পারি নাই। যেহেতু আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি উঠে এসেছে এখন আমরা ওনাদের অনুরোধ করবো আমাদের শিক্ষার্থীদের যেনো যাতায়াতের কোন ব্যাঘাত না ঘটে সেই ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

ধামরাই সরকারি কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা পরিবহন বাস দুটি নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করে ফিটনেসবিহীন বাস উদ্বোধন করা হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের একটাই দাবি আনুষ্ঠানিকতা নয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বৈধ ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক।



banner close
banner close