রবিবার

১৪ জুন, ২০২৬ ৩১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

কানসাটের আম বাজারে চাষিরা দাম ভালো পেলেও খাজনা ও দালালচক্রের সিন্ডিকেটে হতাশ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:

প্রকাশিত: ১৪ জুন, ২০২৬ ১৯:৪২

শেয়ার

কানসাটের আম বাজারে চাষিরা দাম ভালো পেলেও খাজনা ও দালালচক্রের সিন্ডিকেটে হতাশ
ছবি বাংলা এডিশন

দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কানসাট আম বাজারে কয়েকদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে আবারও চাঙ্গা হয়েছে আমের বাজার। গত দুই দিনে বিভিন্ন জাতের আমের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে আম চাষিদের মধ্যে। তবে অতিরিক্ত খাজনা আদায়, ৫৬ কেজিতে মণ নির্ধারণ, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং যানজটের কারণে এখনো নানা ভোগান্তিতে রয়েছেন চাষিরা।

সরেজমিনে কানসাট আম বাজার ঘুরে চাষি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে আমের উৎপাদন ভালো হলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় মৌসুমের শুরুতে দাম কম ছিল। তবে গত দুই দিন ধরে বাজারে প্রায় সব জাতের আমের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

চাষিদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি খাজনা দিতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চাষিদের কাছ থেকে একাধিকবার খাজনা আদায় করা হচ্ছে। এমনকি খালি ক্যারেটেরও খাজনা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে লক্ষণভোগ, গুটি, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ব্যানানা, বারি-৪, সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন জাতের আম ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার গোপালভোগ আম প্রতি মণ বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। বর্তমানে তা বেড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লক্ষণভোগ, যা আগে ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়।

এছাড়া ক্ষীরসাপাত আমের দাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকার পরিবর্তে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় উঠেছে। লখনা ও ল্যাংড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকার পরিবর্তে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায়। ব্যানানা আমের দাম ৩ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। রানীপ্রসাদ বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। কাটিমন আমও ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শাহাবাজপুর ইউনিয়নের কয়লাবাড়ি গ্রামের আম চাষি মোস্তফা বলেন, “গত দুই দিন ধরে বাজার কিছুটা ভালো হলেও উৎপাদন খরচ প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে গেছে। অধিকাংশ জাতের আমে মণপ্রতি উৎপাদন খরচ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। ব্যানানা ও কাটিমন আমে খরচ আরও বেশি। লাভ খুব বেশি হবে বলে মনে হয় না।”

শিবগঞ্জের আম চাষি মিনহাজ উদ্দিন জানান, তিনি ১৮ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আম চাষ করছেন। তার ভাষ্য, “প্রায় ২০০ মণ আম উৎপাদনের আশা করছি। উৎপাদন খরচই প্রায় ১০ লাখ টাকা। তবে শেষ পর্যন্ত বর্তমান দামের ধারা অব্যাহত থাকলে কিছু লাভের মুখ দেখা যেতে পারে।”

কানসাটের আম ব্যবসায়ী রায়হান আলী বলেন, “এ বছর বাজারটি আগের বছরের তুলনায় এক কোটি টাকা কমে ইজারা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু খাজনা আদায়ে ছাড় নেই। কুরিয়ার সার্ভিসে আম বুকিং দিতেও খাজনা নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।”

অন্যদিকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কানসাট আম বাজারের ইজারাদার মো. আলমগীর জুয়েল বলেন, “পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবকসহ প্রায় ৫০ জন যানজট নিরসনে কাজ করছেন। অতিরিক্ত খাজনা নেওয়া হচ্ছে না। কোথাও তিনবার খাজনা আদায়ের অভিযোগ সত্য নয়।”

কানসাট আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপু বলেন, “ঢাকা থেকে খালি ক্যারেট আনলেও এর খাজনা নিচ্ছে। চাষি আম বিক্রির সময় একবার, আড়তে একবার এবং কুরিয়ারে বুকিং দেওয়ার সময় আরও একবার খাজনা নিচ্ছে। আর আমের ভরা মৌসুমে একটি গোষ্ঠী আম কাঁচামাল হওয়ার পরও অযৌক্তিক ৪০ কেজিতে মণ ধরে আম কেনা বেচার আন্দোলনের গ্যাঁড়াকলে ফেলে আম বাজারের পরিবেশ অস্থিতিশীল করছে।"

এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, “সরকার নির্ধারিত হারে খাজনা আদায় করা হচ্ছে। কুরিয়ারের সামনে বা একাধিকবার খাজনা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর আমের ফলন ভালো হয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারকে প্রভাবিত করেছে। তিনি বলেন, “বর্তমান দরে কৃষক লোকসানে পড়বেন না। আমের রপ্তানি ও বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো গেলে চাষিরা আরও ন্যায্য মূল্য পাবেন।”

স্থানীয়দের আমচাষীদের মতে, আমের বাজারে দাম বাড়লেও অতিরিক্ত খাজনা, ওজন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক এবং দালাল চক্রের প্রভাব কমানো না গেলে কানসাটের আম চাষিরা কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবেন।



banner close
banner close