মঙ্গলবার

২৩ জুন, ২০২৬ ৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

দৃষ্টিহীন মুখলেসের ৫০ বছরের সংগ্রাম, মায়ের মুখে খাবার জোগানই যার লক্ষ্য

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ জুন, ২০২৬ ১৫:৫৩

শেয়ার

দৃষ্টিহীন মুখলেসের ৫০ বছরের সংগ্রাম, মায়ের মুখে খাবার জোগানই যার লক্ষ্য
ছবি সংগৃহীত

দুই চোখে আলো নেই, তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। অনুমানের শক্তি আর অদম্য মনোবলকে সঙ্গী করে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে একই পথে হেঁটে চলেছেন দৃষ্টিহীন মুখলেসুর রহমান। প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কাঠ কুড়িয়ে ও শ্রম দিয়ে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের এবং বৃদ্ধ মায়ের সংসার।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামের মৃত মোরশেদ আলী ও রুলি বেগমের ৫৬ বছর বয়সী ছেলে মুখলেসুর রহমান জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। চোখে দেখতে না পেলেও জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে থামাতে পারেনি। শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর করে রাস্তার বাঁক, ধুলোবালি আর পরিচিত পথের অনুভূতিকে সঙ্গী করে প্রতিদিন তিনি বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কলেজ মোড়ের একটি কাঠ কাটার মিলে যান।

স্থানীয়রা জানান, মুখলেস গত ৫০ বছর ধরে একই রাস্তা ব্যবহার করছেন। অন্য কোনো পথ তিনি চেনেন না। প্রতিদিন সকালে একটি বস্তা নিয়ে তিনি মিলে যান। সেখানে ইট দিয়ে পিটিয়ে গাছের ছাল ছাড়ানোর কাজ করেন। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম শেষে সেই ছাল ও কাঠ বস্তায় ভরে মাথায় নিয়ে আবারও একই পথ ধরে বাড়িতে ফেরেন।

পরে তার বৃদ্ধ মা রুলি বেগম সেই কাঠ বাজারে বিক্রি করেন। কাঠ বিক্রির সামান্য আয় দিয়েই চলে তাদের দুবেলার খাবার। বৃষ্টি হলে তাদের জরাজীর্ণ ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। রাতেও নানা কষ্টে কাটাতে হয় তাদের।

চার সন্তানের জননী রুলি বেগমের এক ছেলে ও এক মেয়ে স্বাভাবিক হলেও দুই ছেলে প্রতিবন্ধী। এরই মধ্যে বড় ছেলে জিম মারা গেছেন। ছোট ছেলে সোহেল রানাও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ফলে দৃষ্টিহীন মুখলেসের চিকিৎসা ও পরিবারের ন্যূনতম সহায়তার জন্য সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও স্বজনরা।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, মুখলেসকে একটি প্রতিবন্ধী কার্ড দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু এই সহায়তায় তার জীবন চালানো সম্ভব নয়। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে আরও সহযোগিতা প্রয়োজন।

তেলিপাড়া ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, “মুখলেস আমাদের গ্রামের মানুষ। তাকে প্রতিবন্ধী কার্ড করে দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন থেকে নিয়মিত কিছু সহায়তা দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে বড় কোনো সুযোগ এলে তার জন্য সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।”

দৃষ্টিহীনতা যেখানে অনেকের জীবনে থেমে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে মুখলেসুর রহমান প্রমাণ করেছেন ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে কঠিন পথও পাড়ি দেওয়া যায়। মায়ের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেওয়ার এই সংগ্রাম আজ হয়ে উঠেছে মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।



banner close
banner close