রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের গঙ্গানন্দদিয়া গ্রামের হঠাৎপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ বছর ধরে চলাচলের রাস্তা না থাকায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন ২০ থেকে ২৫টি পরিবার। রাস্তা না থাকায় মৃত ব্যক্তির লাশ পর্যন্ত নিজ বাড়ি থেকে বের করতে না পেরে অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে নিয়ে যেতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় বাসিন্দা সিমা খাতুন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “অনেক মানুষ মারা যায়, কিন্তু রাস্তা না থাকায় লাশ বের করা যায় না। অন্যের বাড়ির ওপর দিয়ে লাশ নিয়ে যেতে হয়। প্রায় ২৫ বছর ধরে আমরা এই কষ্ট ভোগ করছি।”
সরেজমিনে জানা যায়, প্রায় ২৫ থেকে ৩০ বছর আগে ইউনিয়নের উত্তম কুণ্ডু, উজ্জ্বল কুণ্ডু ও উৎপল কুণ্ডুর কাছ থেকে হঠাৎপাড়া এলাকার বিভিন্ন পরিবার জমি ক্রয় করে। তবে জমি ক্রেতাদের যথাযথভাবে জমি বুঝিয়ে না দেওয়ায় চলাচলের রাস্তা নির্ধারণ ও নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু রাস্তার সমস্যাই নয়, অনেকেই তাদের ক্রয়কৃত জমির দখলও বুঝে পাননি। কেউ কেউ একই জমি একাধিকবার কিনেও দখল বুঝে পাননি। আবার অনেকে নিজেদের জমি না পেয়ে অন্যের জমিতে বসবাস বা দখল করে আছেন। ফলে নতুন করে বাড়িঘর নির্মাণেও বাধার সৃষ্টি হচ্ছে।
ভুক্তভোগী কৃষক বক্কর বলেন, “রাস্তা না থাকায় কৃষিজমির ফসল বাড়িতে আনতে পারি না। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে পারে না। কেউ অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্সও প্রবেশ করতে পারে না। প্রতিদিন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।”
আরেক ভুক্তভোগী জানান, তিনি ১৫ শতাংশ জমি কিনেছেন। কিন্তু এখনো জমির দখল বুঝে পাননি। তার দাবি, অন্য একজন তার জমি দখল করে রেখেছেন এবং জমি বিক্রেতারা এ বিষয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।
খায়রুল নামের এক বাসিন্দা বলেন, “প্রথমে আমার বাবা সজল কুণ্ডুর কাছ থেকে জমি কেনেন। পরে একই জমি আবার কিনতে হয়েছে। তারপরও আমরা জমি বুঝে পাইনি।”
মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রায় ২৬ বছর আগে তিনি ৩০ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। তার দাবি, একই জমি তিনবার কেনার পরও এখনো জমির সীমানা নির্ধারণ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। বর্তমানে তার জমি শামীম নামের এক ব্যক্তি দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পাংশা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
হাবাসপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফ খান বলেন, “সজল কুণ্ডু অত্যন্ত চতুর একজন ব্যক্তি। তিনি এলাকার খেটে খাওয়া মানুষের কাছে জমি বিক্রি করেছেন। কিন্তু জমি বুঝিয়ে না দিয়ে নানা টালবাহানা করছেন। ফলে ক্রেতারা দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার না করে অভিযুক্ত সজল কুণ্ডু বলেন, “আমাদের এই সম্পত্তি ভিপি (ভেস্টেড প্রপার্টি) ছিল। কাগজপত্রে কিছু জটিলতা ছিল। বর্তমান সরকারের সময়ে কাগজপত্র ঠিকঠাক করে জমি বিক্রি করা হয়েছে। এটি শুধু আমার একার বিষয় নয়, আমার আরও দুই ভাইয়ের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তারা ঢাকায় থাকেন। তিন ভাই একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত না নিলে আমি এককভাবে কিছু করতে পারব না।”
সজল কুণ্ডুর ভাই কাজল কুণ্ডু বলেন, “জমি বিক্রির বিষয়টি আমার ভাই সজল দেখাশোনা করেছেন। এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত কিছু জানি না।”
দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি নিরসনে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তাদের দাবি, জমির সীমানা নির্ধারণ, মালিকানা জটিলতা নিরসন এবং একটি চলাচলযোগ্য রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হোক।
আরও পড়ুন:








