অতিরিক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে বরিশাল অঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু ও কিশোর দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যায় ভুগছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। বিশেষ করে মায়োপিয়া বা স্বল্পদৃষ্টির হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
চিকিৎসকদের মতে, মায়োপিয়া এমন একটি চোখের সমস্যা, যেখানে কাছের বস্তু স্পষ্ট দেখা গেলেও দূরের বস্তু ঝাপসা দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন, ট্যাব, কম্পিউটার কিংবা বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা, সূর্যের আলোয় কম সময় কাটানো এবং ঘরের ভেতরে বেশি সময় অবস্থান করাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সম্প্রতি শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অনেক শিশু মোবাইল ফোনে ইউটিউব দেখছে বা গেম খেলছে। শুধু শিশু ওয়ার্ড নয়, হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে আসা শিশুদের মধ্যেও মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ করা গেছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহরাঞ্চলে খেলাধুলার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় শিশুদের একটি বড় অংশ অবসর সময় মোবাইল ফোনে কাটায়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে খাওয়ানোর জন্যও মোবাইল ফোনের আশ্রয় নিতে হয়। ফলে ধীরে ধীরে তারা মোবাইলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিশির দাস, যিনি চিকিৎসার জন্য শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন, জানান যে স্কুল, কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার ব্যস্ততার কারণে খেলাধুলার সুযোগ খুব কম। তাই অবসর সময়ে তিনি নিয়মিত ইউটিউব দেখেন ও মোবাইলে গেম খেলেন। এর ফলে তার চোখে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে।
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু রোগীদের ওপর সম্প্রতি পরিচালিত একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ শিশু-কিশোর মোবাইল আসক্তিজনিত কারণে দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় আক্রান্ত।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকারী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিশুদের মোবাইল আসক্তি শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, পরিবারে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগের অভাব, পাশাপাশি শিশুদের জন্য খেলাধুলা ও বিনোদনের সীমিত সুযোগ এ সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, প্রতিদিন হাসপাতালে আসা শিশু রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের চোখের সমস্যার সঙ্গে অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার হার দ্রুত বাড়ছে এবং অনেক শিশুকে অল্প বয়সেই উচ্চমাত্রার চশমা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, অনেক অভিভাবক শিশুকে খাওয়ানো বা শান্ত রাখার জন্য মোবাইল ফোন হাতে তুলে দেন। এতে শিশুদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভরতা যেমন বাড়ে, তেমনি দৃষ্টিশক্তির সমস্যাও তীব্র হয়। মায়োপিয়া একবার হলে সাধারণত চশমা ছাড়া স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই শিশুদের মোবাইল ব্যবহারের সময়সীমা নিয়ন্ত্রণ এবং বাইরে খেলাধুলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরও পড়ুন:








