মঙ্গলবার

২ জুন, ২০২৬ ১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

মোহাম্মদপুরে ১০৮ ছিনতাই স্পট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ জুন, ২০২৬ ০৭:২৪

শেয়ার

মোহাম্মদপুরে ১০৮ ছিনতাই স্পট
ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানী ও আশপাশের ৪৩২টি ছিনতাই স্পটের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০৮টি স্পট মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত। এসব স্থানে অন্তত ২০৫ জন সক্রিয় ছিনতাইকারী জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় একাধিক আলোচিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ঈদুল আজহার ছুটি শেষে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফেরা দুই নারী শনিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে মোহাম্মদপুরের নুরজাহান রোড এলাকায় নিজ বাসার সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, চাপাতি হাতে দুই ছিনতাইকারী তাদের ভয় দেখিয়ে লাগেজ, ব্যাগ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এর আগে গত ৭ মার্চ রাতে ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে হাঁটার সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন ছিনতাইয়ের শিকার হন। তিন ছিনতাইকারী তার কাছ থেকে দুটি আইফোন, ২০ হাজার টাকা, মানিব্যাগ, দুটি ভিসা কার্ড ও একটি হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেয়। আইফোনের পাসওয়ার্ড জানতে চাওয়ার সময় হামলার শিকার হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই, ডাকাতি, লুটপাট ও হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ছিনতাইকারীদের বাধা দিলে অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর আহত হওয়া কিংবা প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। নিয়মিত ব্লক রেইড ও বিশেষ অভিযান পরিচালিত হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢাকা উদ্যানের নবীনগর হাউজিং, চাঁদ উদ্যান, চন্দ্রিমা হাউজিং, তিন রাস্তার মোড়, জেনেভা ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকা, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, টাউন হল, বছিলা বেড়িবাঁধ এবং বছিলা ব্রিজ এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ঘটে। সংঘবদ্ধ চক্রগুলো চাপাতি বা সামুরাই প্রদর্শন করে পথচারী ও যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নিচ্ছে। অনেক সময় অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেও এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে অনেকেই হুমকি ও হামলার শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন বাড়ির মালিককে সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে ফেলতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কাঁটাসুর এলাকায় একাধিক বাসার গেটের সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।

চাঁদ উদ্যান এলাকার নিরাপত্তাকর্মী নবী উল্লাহ জানান, ছিনতাইকারীরা সিসিটিভি ক্যামেরা খুলে ফেলতে চাপ দেয়। নির্দেশ না মানলে তাকে ও তার সন্তানকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় বাড়ির মালিক ক্যামেরা অপসারণ করেন।

শুধু সাধারণ মানুষ নয়, পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ১১ মে ভোরে মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকায় অভিযানের সময় ছিনতাইকারীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পরে পুলিশ পাল্টা ব্যবস্থা নিলে এক ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয় এবং তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুজ্জামান রাকিব জানান, সম্প্রতি দুই নারীকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় তিনজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং পুরো চক্রকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে অর্ধশতাধিক অপরাধী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি বড় গ্যাং রয়েছে, যাদের প্রতিটিতে ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য রয়েছে। সম্প্রতি একতা হাউজিং এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যতম নেতা রুবেল ওরফে মাওরা রুবেলকে দেশীয় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে আদাবর এলাকায় এক ডেলিভারিম্যানকে মারধর করে সর্বস্ব ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ৪৩২টি ছিনতাই স্পটে অন্তত ৯৭৯ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় রয়েছে। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার আসামি। মোহাম্মদপুরে সক্রিয় ২০৫ জন ছিনতাইকারীর প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) এনএম নাসিরুদ্দিন বলেন, মোহাম্মদপুরে পুলিশ ও যৌথবাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। তবে নদী ও বেড়িবাঁধসংলগ্ন অবস্থানের কারণে অপরাধীরা দ্রুত এলাকা ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।



banner close
banner close