বুধবার

২৭ মে, ২০২৬ ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

জেলে পল্লীতে নেই ঈদের আমেজ

পিরোজপুর প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৭ মে, ২০২৬ ১৬:৩৩

শেয়ার

জেলে পল্লীতে নেই ঈদের আমেজ
ছবি বাংলা এডিশন

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে হলেও পিরোজপুরের জেলে পল্লীগুলোতে নেই উৎসবের আমেজ। সামুদ্রিক মৎস্য সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণ নিশ্চিত করতে সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে জেলার প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার নিবন্ধিত সমুদ্রগামী জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। নিষেধাজ্ঞার পাঁচ সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ জেলে সরকারি বরাদ্দের চাল না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তারা।

সরেজমিনে পিরোজপুরের পাড়েরহাট জেলে পল্লী ও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে দেখা যায়, ঘাটজুড়ে সারি সারি মাছ ধরার ট্রলার নোঙর করে রাখা হয়েছে। সাগরে যেতে না পারায় অনেক ট্রলারে চলছে মেরামতের কাজ। যে অবতরণ কেন্দ্রে প্রতিদিন ভোর থেকে লাখ লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা হতো, সেখানে এখন বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। নেই আগের কোলাহল কিংবা কর্মচাঞ্চল্য।

কেউ জাল বুনছেন, কেউ ট্রলার মেরামতের কাজে ব্যস্ত। আবার অনেকে কাজের অভাবে বাড়ি ফিরে গেছেন। কেউ কেউ জীবিকার তাগিদে দিনমজুরের কাজ করছেন। একই চিত্র দেখা গেছে জেলার জিয়ানগর উপজেলার সাঈদখালী চর ও মঠবাড়িয়া উপজেলার মঝেরচরসহ বিভিন্ন জেলে পল্লীতে।

জেলেরা জানান, একদিকে আয় বন্ধ, অন্যদিকে এনজিও ও মহাজনের ঋণের চাপ তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। অনেকের অভিযোগ, জেলে কার্ড না থাকায় সরকারি সহায়তার আওতায়ও আসতে পারছেন না তারা।

জেলে কাউয়ুম হাওলাদার বলেন, “মোগো দিন খুব খারাপ যায়। বর্তমানে কোনো আয় নাই। সরকার যদি কোনো সহযোগিতা বা কাজের ব্যবস্থা করতো, তাইলে নাতি-পুতি নিয়া একটু ভালো থাহা যাইতো।”

আরেক জেলে জাকির শেখ বলেন, “এই অবরোধের ভিতরে আমরা জাল হারতেছি। কোনো ঈদ নাই আমাগো। সপ্তাহে এক-দুইদিন কাজ হয়। এতদিন অবরোধ গেল, এহনও চাল পাইনাই। লোনের কিস্তির জন্য লোক আইয়া বইয়া থাহে। মাইয়া-পোলারে পড়াইতেও পারি না।”

বিলকিস নামে এক জেলের স্ত্রী বলেন, “আমার স্বামীর কোনো ইনকাম নাই। এক কেজি চাল আনলে দুইদিন খাই। নিজে না খাইয়া থাকি, নাতিগো খাবার দিতে হয়। না থাকলে পামু কোতায়?”

ট্রলার শ্রমিক ইদ্রিস আলী বলেন, “এই অবরোধের মধ্যে ট্রলার মালিকরা ট্রলার ডকে এনে মেরামত করতেছে। এজন্য কিছুদিন কাজ পাইতেছি। এরপর আর কোনো কাজ থাকব না। মাঝে মধ্যে অন্যের বাড়িতে বদলা দিয়া চলতে হয়।”

জেলেদের দাবি, নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হলে তারা এতটা সংকটে পড়তেন না। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সময় সমন্বয় করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় ভবিষ্যতে সাগরে মাছের উৎপাদন বাড়বে বলেও আশা প্রকাশ করেন তারা।

এ বিষয়ে সঞ্জীব সন্নামত বলেন, “জেলেদের ৫৮ দিনের সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে জেলায় ৫ হাজার ৩৯৩ জন জেলের মাঝে পরিবারপ্রতি ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি হারে মোট ৪১৭ দশমিক ০৪১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কেউ বাদ পড়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়ে পরবর্তীতে সহায়তা পাবে।”

তিনি আরও বলেন, চাল বিতরণে কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও মৎস্য কর্মকর্তার কাছে আবেদন করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ পাবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

উল্লেখ্য, ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ৫৮ দিনের এ নিষেধাজ্ঞা আগামী ১১ জুন পর্যন্ত চলবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ সময়ে পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত না করা গেলে উপকূলীয় অঞ্চলে মানবিক সংকট আরও বাড়তে পারে।



banner close
banner close