কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক মামলাব্যবস্থা চালু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারকচক্র এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যানবাহনের মালিকদের ব্যাংক কার্ডের তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ফিলিপাইনের কান্ট্রি কোডযুক্ত (+৬৩) আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে ফিশিং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কার্ড তথ্য চুরির এ ঘটনায় ইতিমধ্যে বহু মানুষ বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতারণার কৌশল
প্রতারকচক্রটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর আদলে তৈরি একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক সংযুক্ত করে মোবাইলে এসএমএস পাঠাচ্ছে। বার্তায় দাবি করা হচ্ছে, ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেমের (আইটিএস) মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট যানবাহনটি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং তাৎক্ষণিক জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভুয়া ওয়েবসাইটে যেকোনো গাড়ির নিবন্ধন নম্বর দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি মামলা তৈরি হয়ে যায় এবং ৩ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারিত হয়। তিন দিনের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করলে ৫০ শতাংশ ছাড়ে দেড় হাজার টাকায় মামলা নিষ্পত্তির প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে। পেমেন্ট ধাপে গেলে কার্ডধারীর নাম, কার্ড নম্বর, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ও সিভিভি নম্বর চাওয়া হয়।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ডিজিটাল ফরেনসিক গবেষক আরিফ মঈনুদ্দীন বলেন, সরকারি সংস্থা কখনো বিদেশি নম্বর বা অপরিচিত ডোমেইন ব্যবহার করে জরিমানার বার্তা পাঠায় না। এটি ব্যাংক কার্ডের তথ্য চুরির উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি পরিকল্পিত ফিশিং চক্র। চুরি হওয়া কার্ড তথ্য ব্যবহার করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে অননুমোদিত আর্থিক লেনদেন সম্ভব।
ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা
একাধিক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। একজন কনটেন্ট নির্মাতা জানান, এসএমএসে ঢাকায় ট্রাফিক আইন ভঙ্গের যে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, সেদিন তার মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি দুটিই চট্টগ্রামে ছিল।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ ও জার্নালিজম বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমানও একই ধরনের এসএমএস পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন।
সাভারের ব্যাংক কলোনি এলাকার বাসিন্দা ও প্রাইভেট কার মালিক মাসুদ রানা জানান, ওয়েবসাইটে তার গাড়ির নম্বর দিলে দেখানো হয় শনিবার সাভারে নিয়ম লঙ্ঘন হয়েছে; অথচ সেদিন তার গাড়িটি ঢাকায় ছিল। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে তিনি বিআরটিএতে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হন যে বার্তাটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
প্রেক্ষাপট: এআই ক্যামেরা ও নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থা
চলতি বছরের ৭ মে রাজধানীর অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অটোমেটেড ট্রাফিক প্রসিকিউশন ব্যবস্থার অধীনে এআইভিত্তিক ক্যামেরার কার্যক্রম শুরু হয়। জাহাঙ্গীর গেট, বিজয় সরণি, কাওরান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ, কাকরাইল, মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট মোড়, উত্তরা-বিমানবন্দর এলাকা ও গুলশান এই প্রথম ধাপের আওতায় রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্তত ৫০০টি পয়েন্টে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২৩ মে পর্যন্ত এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ৬১১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন অতিক্রম, বিপরীতমুখী যাত্রা, অবৈধ পার্কিং ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামাকে প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। লঙ্ঘন শনাক্ত হলেই ক্যামেরা ছবি ও ভিডিও ধারণ করে এবং সফটওয়্যার নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে বিআরটিএর তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রস্তুত করে।
পুলিশ ও বিআরটিএর বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) এনএম নাসিরুদ্দিন জানান, ট্রাফিক বিভাগের নামে ভুয়া এসএমএস ও অনলাইন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিমূলক। সড়ক পরিবহণ আইন-২০১৮ অনুযায়ী মামলা হলে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের ঠিকানায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত সরকারি চিঠি পাঠানো হয়। প্রয়োজন হলে কেবল ০১৩২০০৪২২০৭ ও ০১৩২০০৪২২২৭ এই দুটি সরকারি নম্বর থেকে এসএমএস পাঠানো হয়। ট্রাফিক বিভাগ কখনো কারো কাছে পিন নম্বর, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চায় না।
ডিএমপির এআই ক্যামেরা বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ জানান, মামলার তথ্য বর্তমানে ডাকযোগে পাঠানো হচ্ছে, মোবাইলে নয়। ইতিমধ্যে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং সে বিষয়ে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিআরটিএ স্পষ্ট করেছে, সংস্থাটি এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো মামলা দায়েরের সুযোগ রাখে না এবং এ ধরনের মামলার জরিমানাও গ্রহণ করে না। বিআরটিএর নাম ব্যবহার করে কেউ অর্থ দাবি করলে তা সম্পূর্ণ প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হবে। সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ এবং ডিএমপি সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এআই ট্রাফিক বা ভিডিও মামলার জরিমানা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপায় ও সিবিবিএল প্ল্যাটফর্মে পরিশোধ করা যাবে।
আরও পড়ুন:








